বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি বৃদ্ধ আটকের পর ভারতীয়কেও স্থানীয়দের আটক, আসলে কী ঘটেছে?

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা বাংলাদেশি এক প্রবীণকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে পড়া এক ভারতীয়কে ধরে আটকে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বিরাজোত সীমান্তে।
বাংলাদেশি নাগরিককে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত ভারতীয় ওই যুবককেও ছাড়া হবে না বলে জানান তারা। পরে খবর পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভারতীয় ওই নাগরিককে নিজেদের হেফাজতে নেন।
পুলিশ বলছে, গত শনিবার গ্রামবাসীর হাতে আটক হওয়া ভারতীয় যুবকের নাম দীপঙ্কর গোপ। সীমান্তে অনুপ্রবেশের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার তাকে কোর্টে তোলা হয়।
পরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, বাংলাদেশের যে প্রবীণকে বিএসএফ আটক করেছে, তার নাম তমিজ উদ্দিন বলে জানিয়েছে পরিবার। প্রায় ৮০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধকেও ভারতীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
পাল্টাপাল্টি এমন আটকের ঘটনার পর বেশ কয়েক দফায় পতাকা বৈঠক করেছে বিজিবি ও বিএসএফ।দুই দেশের আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তমিজ উদ্দিনের আটক নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
বিএসএফের হাতে আটক হওয়া তমিজ উদ্দিন বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার অন্তর্গত সাতমেরা ইউনিয়নের বিরাজোত গ্রামে।
স্বজনদের ভাষ্যমতে, তমিজ উদ্দিন গত পাঁচই অগাস্ট সকালে ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন একটি মাঠে গরু চরাতে গিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে একটি গরু বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ভূ-খণ্ডে ঢুকে পড়ে। সেই গরু আনতে গেলে বিএসএফের সদস্যরা তমিজ উদ্দিনকে আটক করে নিয়ে যায়।
“আমার বাবার ৮০ বছর বয়স। সে ভালোমত হাঁটতেও পারে না, ঠিকমত কানেও শোনে না। সে ইচ্ছা করে ওপারে যায়নি। গরু চলে গেছে বলে পিছে পিছে গেছে,” সাংবাদিকদের বলেন তমিজ উদ্দিনের ছেলে আজাহার আলী।
ঘটনার পর তমিজ উদ্দিনের আটক হওয়ার খবরটি স্থানীয় বিজিবিকে জানানো হয়। “কিন্তু এখন পর্যন্ত বাবাকে ফেরত আনা হয়নি। আমার বাবা না বুঝে ওপারে চলে গেছে। আমরা তার মুক্তি চাই,” বলেন আজাহার আলী।
বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটকের পর বিএসএফ সদস্যরা তমিজ উদ্দিনকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
দীপঙ্কর গোপ আটক হলেন কীভাবে?
বাংলাদেশ সীমান্তে আটক দীপঙ্কর গোপ পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের আওতাধীন কুকুরজান গ্রামের বাসিন্দা বলে জানা যাচ্ছে।
তার প্রতিবেশিরা জানান, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে দীপঙ্কর গোপের ছোট একটি চা বাগান রয়েছে। গত শনিবার সকালে সেখানে কাজ করতে গিয়েছিলেন গোপ।
“অন্য দিনের মতোই সীমান্তের গেটে নথি দেখিয়ে নাম লিখিয়ে ও চা বাগানে কাজে গিয়েছিল। আরও কৃষকরাও ছিল কাছাকাছি। হঠাৎই তারা খেয়াল করে যে, দীপঙ্করকে দেখা যাচ্ছে না,” বলছিলেন বিশ্বনাথ রায় নামে গোপের এক প্রতিবেশি।
পরে তারা জানতে পারেন, বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে পড়ার কারণে বিরাজোত গ্রামের বাসিন্দারা তাকে ধরে নিয়ে গেছে। “এরপর আমরা জানতে পারি যে, কয়েক দিন আগে যে বাংলাদেশি মানুষকে এদিকে চলে আসার জন্য ধরা হয়েছিল, তাকে না ছাড়লে দীপঙ্করকে ফেরত দেবে না,” বলেন বিশ্বনাথ রায়।
পঞ্চগড়ের বিরাজোত গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, ভারতীয় সীমান্তের কাছে ফয়জুল ইসলাম নামের এক বাংলাদেশির একটি আখের খেত রয়েছে। দীপঙ্কর গোপ ওই খেত থেকে ‘আখ চুরি করতে গেলে’ তাকে আটক করা হয় বলে দাবি করেছেন বিরাজোত গ্রামের বাসিন্দারা।
“ওই লোক এসে আখখেত থেকে চুরি করে আখ ভাঙতেছিল। তখন সেখানে আমাদের এক ভাই ছিল পাহারায়। ও আমাদের ফোন দেয়। এরপর আমরা সবাই দৌড়ে যেয়ে ভারতের ওই লোকরে আটক করি,” বলেন তমিজ উদ্দিনের ছেলে আজাহার আলী।
“ওই জমি তো আজকের না, ওর বাপ ঠাকুর্দার বিরাট জমি ছিল। কতদূর অবধি জমি, কোথায় বর্ডার পিলার, এসব আমাদের মুখস্থ। কেন ও সীমান্ত পেরিয়ে ওদিকে চলে যাবে?”, প্রশ্ন বিশ্বনাথ রায়ের।
“আমার বাবাকে আগে ফেরত দেবে, তাহলে আমরাও ভারতের লোককে ফেরত দেবো,” গত শনিবার দীপঙ্কর গোপকে ধরে আনার পর সাংবাদিকদের বলেন আজাহার আলী। পরে খবর পেয়ে বিজিবি ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান এবং ভারতীয় ওই নাগরিককে নিজেদের হেফাজতে নেন।
বিক্ষোভ, পতাকা বৈঠক
দীপঙ্কর গোপের আটকের খবর জানার পর তার মুক্তির দাবিতে স্বজন ও গ্রামের বাসিন্দারা বিক্ষোভ শুরু করে। “এ নিয়ে আমাদের গ্রামে যথেষ্ট ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গ্রামের নারীরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও বিষয়টি জানিয়েছি আমরা। তারা গ্রামে এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে,” বলছিলেন দীপঙ্কর গোপের প্রতিবেশি বিশ্বনাথ রায়।
এ অবস্থায় বিজিবি ও বিএসএফের কর্মকর্তারা বিষয়গুলো নিয়ে দফায় দফায় পতাকা বৈঠক করেন। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে পঞ্চগড়ের স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে যে, শুরুতে তারা পতাকা বৈঠকের মাধ্যমের সমস্যাটির সমাধান করতে চেয়েছিলেন। সেজন্য আটকের পরপরই দীপঙ্কর গোপের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের না করে অপেক্ষা করছিলেন তারা।
কিন্তু পতাকা বৈঠকের একপর্যায়ে বিএসএফের পক্ষ থেকে বিজিবিকে জানানো হয় যে, বাংলাদেশি নাগরিক তমিজ উদ্দিনকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলাসহ অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এটি জানার পর গত রবিবার ভারতের নাগরিক দীপঙ্কর গোপকেও পঞ্চগড় জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। এরপর রাতেই তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা করা হয়।
“আমরা ওই লোকটাকে নিয়ে এসেছি গত (রবিবার) সন্ধ্যায়। নিয়ে এসে মামলা রেকর্ড করে তাকে কোর্টে চালান দেওয়া হয়,” বলছিলেন পঞ্চগড় জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু সাইম।
বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়মের মধ্যে থেকেই তারা উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। “যা হবে, আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের মধ্যে নিয়ম, আইন মেনেই করা হবে,” বলেন ওই কর্মকর্তা।
কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তমিজ উদ্দিন এবং দীপঙ্কর গোপ ঠিক কবে নাগাদ বাড়ি ফিরতে পারবেন, সেটি এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা।
source: The Dhaka Diary