News
আদিবাসী স্বীকৃতি দেয়া মানে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর রাষ্ট্রের অধিকার হারানো: তাজুল ইসলাম

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া মানে হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর রাষ্ট্রের অধিকার হারানো। কারণ, আদিবাসী হিসেবে তখন জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী ভূখণ্ডের ওপর, সম্পদের ওপর, সামরিক বাহিনী—তাদের সবকিছু নিজস্ব হবে। তার মানে বাংলাদেশের এই এক-দশমাংশ ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে। বিষয়টা এত সিম্পল না। আমাদের রাজনীতিবিদদের বিষয়টা ভালোভাবে উপলব্ধি করা দরকার।’
গতকাল মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আন্দোলন জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “২০০৭ সালে নিজে বাদী হয়ে হাইকোর্ট ডিভিশনে একটা রিট পিটিশন করেছিলাম। ওই রিট পিটিশনের একটা আদেশের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা প্রথমবারের মতো ভোটার হয়েছিলেন। কারণ, ভোটার হওয়ার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের শর্ত হচ্ছে স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত—দীর্ঘদিন বসবাস করলেই হবে না, ওখানে তার নিজস্ব জমি থাকতে হবে। আর জমি থাকতে হলে আপনি জমি কেনার পারমিশন পাবেন না, বাঙালি হলে, যদি না তাদের হেডম্যানরা আপনাকে পারমিশন দেয়। আর হেডম্যানরা সবাই হচ্ছে ওই গোষ্ঠীর মানুষ। তারা কখনোই সাধারণ বাঙালিকে জমি কেনার পারমিশন দেয় না।’’
তিনি আরও বলেন, “যে কারণে ওই পিটিশনে প্রথমবারের মতো অর্ডার নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ওয়ান-ইলেভেনের গভর্নমেন্টের পরে যে ২০০৮ সালে নির্বাচন হয়েছিল, সেখানে প্রথমবারের মতো বাঙালিরা ভোটার হন। ওইখান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করার চেষ্টা করছিল আওয়ামী লীগ সরকার এসে। রিট পিটিশনে আমি ইনজাংশন নিয়েছিলাম, সেনা ক্যাম্প যাতে প্রত্যাহার করা না যায়। পরবর্তীতে সেই মামলার শুনানি হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮—যেটার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটা নতুন রাষ্ট্র তৈরি করা হয়েছে। এটাকে বলা হয় ‘স্টেট উইদিন দ্য স্টেট’। সেটার নিজস্ব পুলিশ মোতায়েনের অধিকার আছে, ইনকাম ট্যাক্স নেওয়ার অধিকার আছে এবং আঞ্চলিক পরিষদে সবাই হচ্ছে উপজাতি; এক-দুজন বাঙালি থাকতে পারে।”
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি বলেন, “শুধুমাত্র আঞ্চলিক পরিষদ নয়, সেই সময়ের ১৯৯২ সালের শান্তিচুক্তির আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় প্রচলিত তিনটা আইন—মানে পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, বান্দরবান জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন এবং রাঙ্গামাটি জেলা পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন—তিনটি আইনে নেসেসারি অ্যামেন্ডমেন্ট এনে সেখানে ওই যে উপজাতি যারা আছেন, তাদেরকে বাঙালিদের, অর্থাৎ সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে অনেক বেশি অধিকার দেওয়া হলো এবং তারা সেখানে বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হলো।”
তাজুল ইসলাম বলেন, “যে কারণে হাইকোর্ট ডিভিশন রায় দিলেন। আজকে চিফ জাস্টিস সৈয়দ রিফাত আহমেদ যখন হাইকোর্ট ডিভিশনে ছিলেন, তিনি রায় দিয়ে এই আঞ্চলিক পরিষদের পুরো জিনিসটাকে বাতিল বলে ঘোষণা করলেন এবং তিনটি আঞ্চলিক স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের যে ধারাগুলো বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার হরণ করেছিল, সেগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করলেন। সেই সময় থেকে গভর্নমেন্ট আপিল করলো। আজ পর্যন্ত আপিলের নিষ্পত্তি হয় নাই। কারণ হচ্ছে, মাঝখানে জাস্টিস সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তিনি কিছু অপকর্ম করে যান। তিনি আরেকটা মামলা—যে হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশনের কথা বলা হলো—এগিয়ে আনলেন। এই আইনে কিছু বিষয় আছে।”
হিল ট্র্যাক্টস আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, “হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০। এটা ব্রিটিশ আমলের আইন। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্ট্যাটাস ছিল ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক আইনই আছে। ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’, ‘নন-রেগুলেটেড এরিয়া’, তারপরে হচ্ছে ‘ট্রাইবাল এরিয়া’—এগুলো নাম ছিল। কিন্তু যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল, যে ভূখণ্ডগুলো পাকিস্তান বলে স্বীকৃত ছিল, সবগুলো বাংলাদেশের টেরিটরির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং এই ১৯০০ সালের আইন এখানে আর চলবে না। ১৯০০ সালের আইন দিয়েই এই সমস্ত নিগ্রহে বাঙালিদের ওপর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। যে কারণে জমি কেনা যায় না, যেটা অন্যান্য আলোচকরা বলছিলেন। এটার গভীর সিগনিফিক্যান্স আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত এই বিষয়গুলো নিয়ে।”
তিনি বলেন, “আমাদের সংসদ সদস্য এবং রাজনীতিবিদদের এই বিষয়টা জানা উচিত। ভবিষ্যতে এই বিতর্কগুলো উঠবে। আমরা ওই এস কে সিনহার কথা বলছিলাম। তিনি এসে রাঙ্গামাটি ফুড প্রোডাক্ট মামলা—আরেকটা কাহিনি করে দিলেন যে, সে আপিল অ্যালাও করে দিয়ে বলল, ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন নাকি এখনো বৈধ আইন। এখন যেটা ডাইরেক্টলি কন্ট্রাডিক্ট করছে আমাদের টোটাল জুরিসপ্রুডেন্সের অন্যান্য আইনের সাথে।”
অবৈধ ডিক্লেয়ার করে যে রায়টা হয়েছিল সে বিষয়ে তিনি বলেন, “সেটার রিভিউ আমরা ফাইল করেছি। একই সঙ্গে হাইকোর্টে আমরা যে আঞ্চলিক পরিষদকে অবৈধ ডিক্লেয়ার করে যে রায়টা হয়েছিল, সেটার আপিলও গভর্নমেন্ট করেছে। সেটা এখন পেন্ডিং আছে। কিন্তু আগামী বৃহস্পতিবারের দিন এটা আবার শুনানির জন্য আসবে। গভর্নমেন্ট বারবার টাইম নিয়ে এটাকে পিছাচ্ছে। সেটেল করার জন্য। কিন্তু আমি মনে করি, এটার সেটেলমেন্ট ওয়ান্স ফর অল হতে হবে।”
শহীদ জিয়াকে তিনি বলেন, “যেটা আমাদের সংবিধানে বলেছেন। সবচেয়ে ভালো কাজটা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব করেছিলেন। যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যখন বলা হলো, তখন আর কেউ আর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক না। আমি বাঙালি বাংলাদেশি, উনারা মং বাংলাদেশী, চাকমা বাংলাদেশি—সুতরাং কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারপরেও মনে রাখতে হবে, এই হিল ট্র্যাক্টসে ১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মোটাদাগে ২১টি গণহত্যায় ৩৮ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার অধিকাংশ বাঙালি। আমাদের একজন বীর উত্তম আছেন—শহীদ লেফটেন্যান্ট মুশফিক, লেফটেন্যান্ট মুশফিকসহ অজস্র সেনাসদস্যের প্রাণ গেছে এই ভূখণ্ডটিকে রক্ষা করার জন্য।”
জিওপলিটিক্যালের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “এইটা জিওপলিটিক্যাল একটা খেলার মাঠে পরিণত করতে চায় নানান অপশক্তি। এইটা আমাদের রাজনীতিবিদদেরকে বুঝতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান একবারের জন্যই করতে হবে। বারবার এইটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা যাবে না।”
সবশেষে তাজুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইন্ধন আছে। ওই যে রুশ ভাই বলেছেন, আশপাশের অঙ্গরাজ্যগুলোতে ক্যাম্প করে সেখান থেকে বাংলাদেশে ইনসার্জেন্সি করা। এই যে কাজগুলো করে ৩৮ হাজার বাঙালি মেরেছে। কখনো আলোচনা করেন আপনারা? আপনারা জানেনও না। পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের আলোচ্য বিষয় হতে হবে। এটা বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড। এটা আমাদের ভূরাজনৈতিক, কৌশলগত ভূখণ্ডের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবশ্যই আমাদের রাজনীতিবিদরা এই ব্যাপারে যথার্থ পদক্ষেপ নেবেন।”
source: The Dhaka Diary