বাংলাদেশ

পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা, টার্গেটে দেশের ১১ প্রভাবশালী পরিবার

পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা, টার্গেটে দেশের ১১ প্রভাবশালী পরিবার

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার তীব্র বিক্ষোভের মুখে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হয়। নাটকীয় এই পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন ড. আহসান এইচ মনসুর। হাসিনার আমলে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজাতদের বিদেশে পাচার করা বিপুল অর্থ দেশে ফেরত আনতে জোরালো প্রচেষ্টা শুরু করেছেন তিনি।

২৮শে মার্চ ‘বাংলাদেশ আপ এগেইন্টস টাইম টু ফাইন্ড স্টোলেন বিলিয়নস: সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নর’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অনলাইন আল জাজিরা। সংবাদমাধ্যমটির ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটকে (আই-ইউনিট) দেয়া এক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারে আহসান মনসুর বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ দেশে ফেরত আনার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন।

আল জাজিরা বলছে, বাংলাদেশের ১১টি প্রভাবশালী পরিবারকে টার্গেট করে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রভাবশালী এসব পরিবারের বিরুদ্ধে গত এক দশক ধরে বৃটেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে কোটি কোটি ডলার পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যাদের সম্পদের সন্ধানে ১১টি বিশেষজ্ঞ দলও গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রশ্নবিদ্ধ এই সম্পদের পরিমাণ আঁতকে ওঠার মতো। ১১টি পরিবারের মধ্যে একটির বিরুদ্ধেই ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে একটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ আমানতই তুলে নিয়ে গেছে তারা। ফলত ব্যাংকটি প্রায় ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

আহসান মনসুর, আইএমএফ-এর সাবেক অর্থনীতিবিদ। শেখ হাসিনার পতনের পর তাকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। পাচারকৃত অর্থ দ্রুত উদ্ধার করা নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। কেননা, দ্রুত সন্ধান না পেলে বেশির ভাগ অর্থ হাওয়া হয়ে যেতে পারে। আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, আমরা জানি সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সম্পদের পরিমাণ কমে যেতে পারে। আহসান মনসুরের সন্ধান কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বৃটেন। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ উদ্ধার এবং জব্দ করার জন্য ইতিমধ্যেই বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কমনওয়েলথ দপ্তর এবং লন্ডনের আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, উল্লিখিত পরিবারগুলোর অনেকেরই এখানে বহু সম্পদ রয়েছে, বিশেষ করে লন্ডনে। তিনি বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো আমরা এই সচেতনতা তৈরি করতে চাই যে, বিশ্ব থেকে চুরি হওয়া সম্পদের প্রিয় হচ্ছে বৃটেন। আর বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর মধ্যে একটি যেখান থেকে এখানে প্রচুর চুরি হওয়া সম্পদ এসেছে।

এর আগে আল জাজিরার আই-ইউনিটের এক খবরে প্রকাশ করা হয়েছে যে, হাসিনার সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর একারই লন্ডন এবং দুবাইতে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের সম্পদ রয়েছে। আই-ইউনিটের ওই খবরটি গত বছর প্রকাশ করা হয়। বৃটেনে সাইফুজ্জামান এবং তার পরিবারের ৩৬০টির বেশি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই লন্ডনে। বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যেই সাইফুজ্জামানের ৪০টি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে এবং তাকে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আর সাইফুজ্জামানের বিদেশে থাকা সম্পত্তি দ্রুত জব্দ করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেন সেগুলো বিক্রি করতে না পারে।

যদিও সাইফুজ্জামানের দাবি হচ্ছে আগের সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘ডাইনি-হান্ট’ শুরু করা হয়েছে। তার সম্পদ বৈধভাবে উপার্জন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন এসব সম্পদ জব্দ করার দিকে মনোনিবেশ করেছে তখন আহসান মনসুর চাচ্ছেন, বৃটেন এবং অন্যান্য জায়গায় এসব অভিজাত পরিবারের কোটি কোটি ডলার পাচারে সহায়তাকারী আইনজীবী, ব্যাংকার এবং এস্টেট এজেন্টদেরও তদন্তের আওতায় আনা হোক। মনসুর বলেছেন, আইন লঙ্ঘন করে অপরাধীদের পুনর্বাসনে সহায়তা করছে এমন এজেন্ট বা ব্যাংক অপারেটর সংখ্যা অনেক। এসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মনসুর জানিয়েছেন, পাচারকৃত অর্থের নিয়ন্ত্রণ পেতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি স্বীকার করেছেন যে, কর্তৃপক্ষের কাজের মাত্রা এবং জটিলতা নিয়ে লড়াই করার কারণে অর্থ উদ্ধার কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতিতে আগাচ্ছে। তবে বৃটেন সরকার এক্ষেত্রে সহায়তা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এসব অপরাধী চক্রের মূল হোতার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য বিদেশে অর্থ পাচারে সহায়তাকারীদের সঙ্গে দর কষাকষি করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি হারিয়ে যাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সূত্র: dailycomillanews

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button