Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
Bd বাংলাদেশ

জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়ম, জেলে কার্ড নয় বিএনপি নেতার স্লিপে মিলছে চাল

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে পদ্মা নদীতে দুই মাসের মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময়ে কর্মহীন জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি মানবিক সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিবন্ধিত জেলেদের জনপ্রতি ৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে ৭৫-৭৬ কেজি করে। এছাড়াও প্রকৃত জেলেদের নাম বাদ দেওয়া এবং পরিবহণের নামে অবৈধভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইলিশ অভয়াশ্রম রক্ষায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে পদ্মা নদীতে নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এই সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের জন্য মাসিক ৪০ কেজি হারে দুই মাসে মোট ৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দেয় সরকার। গতকাল ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরভাগা ইউনিয়ন ১২০০ জন জেলের চাল বরাদ্দ দেয় উপজেলা খাদ্য বিভাগ। নিয়ম অনুযায়ী জনপ্রতি ৮০ কেজি চাল দেওয়ার বিধান থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৭৫-৭৬ কেজি। ফলে জনপ্রতি ৪-৫ কেজি করে চাল কম পেয়েছেন জেলেরা। এছাড়াও কার্ডধারী প্রকৃত জেলেরা চাল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গতকাল চাল না পেয়ে অনেক জেলেই খালি হাতে ফিরছেন। তবে রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে চাল বিতরণ করা হয়। এমনি একটি কার্ডের চাল ভাগ করে দেওয়া হয়েছে চারজনকে। অভিযোগ উঠেছে, জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চালের স্লিপ বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও, প্রতিটি স্লিপ বিক্রি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। আর এই পুরো ঘটনা ঘটছে খোদ সরকারি কর্মকর্তাদের সামনেই। এসব অনিয়মের পেছনে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে চরভাগা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার বাচ্চু প্রধানীয়া, ইব্রাহীম মেম্বার সহ কয়েকজন বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় সকাল ৮ থেকে ১০ পর্যন্ত দুই শতাধিক জেলেদের স্মার্ট কার্ড দেখে চাল বিতরণ করা হয়। তবে ওজনে কম দেওয়া হয়। এরপর বাচ্চু মেম্বার সহ স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার নির্দেশে জেলেদের চাল দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। কার্ড ধারি জেলেকে চাল না দেওয়ায় বিতরণে হট্টগোল তৈরি হয়। এসময় সাংবাদিকদের দেখে জেলেরা অভিযোগ করে বলেন তাদের চাল দেওয়া হচ্ছে না পাশাপাশি ইব্রাহীম মেম্বার ও বাচ্চু মেম্বারের সাক্ষরিত স্লিপ ছাড়া কাউকে চাল দিচ্ছে না। আর স্লিপ দিয়ে যাদের চাল দেওয়া হচ্ছে তারা কেউ জেলে নয়। অভিযোগের সত্যতা জানতে চাল নিতে আসা লাইনে দাঁড়ানো একাধিক লোকের কাছে তাদের জেলে কার্ড দেখতে চাইলে স্লিপ ছাড়া কিছুই দেখাতে পারেনি তারা। কেউ মুদি দোকান ব্যবসায়ী কেউবা ঢাকায় চাকুরী করেন। জেলে কি না এমন প্রশ্নে তাদের উত্তর চাল নিতে জেলে হতে হয় না। তারা বিএনপির পক্ষে থেকে এসেছেন এবং এই স্লিপ তাদের স্থানীয় বিএনপি নেতা ইউপি সদস্য বাচ্চু প্রধানীয়া ও ইব্রাহিম মেম্বার দিয়েছেন বলে জানান। পরে ভুক্তভোগী জেলেদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালেও উপজেলা প্রশাসন তদন্তের কথা বলে চাল বিতরণ বন্ধ করে দেন। ঘন্টা খানিক বিতরণ বন্ধ থাকলেও দুপুর ১ টার দিকে একই ভাবে স্লিপের মাধ্যমে বিতরণ করে দায়িত্বে থাকা ট্যাগ অফিসার।

৪ নং ওয়ার্ডের জেলে রতন মিয়া অভিযোগ করেন, আমাদের ৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও মেম্বার বাচ্চু প্রধানীয়া দিয়েছে ৭৫ কেজি। বাকি চাল নাকি অন্য জেলেদের দেবে। আমি জানতে চাইলে আনার সাথে খারাপ আচরণ করে চাল বিতরণ করা বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও জেলেদের চাল না দিয়ে টাকার বিনিময়ে স্লিপের মাধ্যমে চাল বিক্রি করেন তারা। এখানে অর্ধেকের বেশি মানুষ জেলে না কিন্তু স্লিপ নিয়ে চাল নিবে। আপনি তাদের ধরেন তাহলে দেখবেন তাদের কাছে জেলে কার্ড নেই এবং তারা জেলেও না।

জসিম উদ্দিন নামে এক জেলে বলেন, সকালে ৮ টার দিকে এসেছি তাও এখনো চাল পাইনি। ইব্রাহীম ও বাচ্চু মেম্বারের সাক্ষর করা স্লিপ ছাড়া কাউকে চাল দেয় না। জেলেদের কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের মারধর করে। আমার ভাই কিছুক্ষণ আগে চাল পাইছে তাকে ৭৫ কেজি চাল দিছে। সে প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করে পরিশোধে আটকে রাখে। যাদের স্মার্ট কার্ড নেই তাদের চাল দেওয়া কথা না কিন্তু টাকার বিনিময়ে স্লিপের মাধ্যমে চাল দিচ্ছে। এখানে অনেকেই আছে ঢাকা থাকে ব্যবসা করে জেলে না তাদের চাল দিচ্ছে। আর জেলেরা চাল নিতে আসলে বলে এইবার চাল কম এসেছে পরেরবার আসলে পাবেন। এছাড়াও পরিবহণ খরচ বাবদ ১০০ টাকা করে আদায় করেছেন আমাদের কাছথেকে। প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করে নিজের ভাই ও আত্মীয়-স্বজনদের চাল দিয়েছেন বাচ্চু মেম্বার।

বাচ্চু মেম্বারের সাক্ষরিত স্লিপ নিয়ে চাল নিতে লাইনে দাড়িয়েছেন সজিব আহমেদ। জেলে কার্ড আছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার কাছে কার্ড নেই এবং আমাদের পরিবারে কেউ জেলে নেই। আমার বাবা বললো বাচ্চু মেম্বার কার্ড দিবে সেই কার্ড নিয়ে পরিষদে গেলে ৮০ কেজি চাল দিবে তাই আমি চাল নিতে এসেছি। এখন সাংবাদিক আসাতে আমাদের চাল দেওয়া বন্ধ। বাচ্চু মেম্বার বললো একটু দাঁড়াও সাংবাদিক গেলে তোমার চাল আগে দিয়ে দিমুনে। তাই লাইনে দাড়িয়ে আছি চাল পেলে চলে যাবো।

একইভাবে স্লিপ নিয়ে চাল পেতে লাইনে দাড়িয়েছেন আব্দুল সাত্তার। জেলে কার্ডের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে বিএনপি পক্ষ থেকে ইব্রাহীম মেম্বার স্লিপ দিয়ে চাল নিতে পাঠিয়েছে আমি এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। আমার কাজ চাল নিয়ে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। আমাকে একা নয় এই স্লিপ আরও বিশ-পঞ্চাশ জনকে দিয়েছে ইব্রাহীম ভাই। আমি মুদি দোকান করি ভাই আমার জেলে কার্ড থাকবে কি ভাবে। আপনি ইব্রাহীম মেম্বারের সাথে কথা বলেন। এর আগে সকালে আপনি একবার চাল নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, আমাকে তিনটা স্লিপ দিয়েছে আমি আগে দুইটা নিছি এখন একটা নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়িয়েছি। ওনারা না দিলে তো আমি নিতে পারতাম না।কি ভাবে নিছি সেটা তাদের জিজ্ঞেস করেন।

অভিযোগের বিষয়ে চরভাগা ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাচ্চু প্রধানীয়া বলেন, অনিয়ম বলতে কিছু নেই এটা সারাদেশে ইচ্ছে। আমাদের কিছু নেতাকর্মী আছে তাদের দেখতে হয়। তাছাড়া সবার তো স্মার্ট কার্ড থাকে না তাই স্লিপ দিয়েছি।এখানে ট্যাগ অফিসার ছিলেন তিনি ভালো বলতে পারবেন। এগুলো দেখার দায়িত্ব আপনার না ট্যাগ অফিসার আছে ইউএনও আছে মৎস কর্মকর্তা আছে তারা দেখবে। আপনি আমাদের মানিক বকাউলের সাথে যোগাযোগ করেন। তবে অভিযোগের বিষয় জানতে আরেক ইউপি সদস্য ইব্রাহীম মল্লিক কে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুনতাসীর মামুন বলেন, আমার অনুপস্থিতিতে কেউ নিতে পারে। তবে আমি জেলে কার্ড ছাড়া কাউকে চাল দিবো না। কেউ যদি লাইনে দাঁড়ায় এটা আমার কিছু করার নেই। আমি তো আর চাল দিচ্ছি না। কিছুক্ষণ আগে একটু হট্টগোল হয়েছিল আমি চাল দেওয়া বন্ধ রেখেছি। এখন ইউএনও স্যারের নির্দেশে আবার চাল বিতরণ শুরু করেছি। ওজন কম দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যায়।

এবিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, এগুলো জাটকা ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল। এখানে কার্ড ছাড়া কাউকে এক কেজি চাল দেওয়ার সুযোগ নেই। স্লিপের মাধ্যমে চাল বিতরণ করা যাবে না। ওখানে আমাদের অফিসের লোক আছে, ট্যাগ অফিসার আছে তাদের দায়িত্ব জেলেদের চাল বিতরণ হবে। আমি কিছুক্ষণ আগে ইউএনও সাহেবের কাছে জানতে পারলাম ওখানে অনিয়ম হচ্ছে। বিষয়টি আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখছি। কেউ জড়িত থাকলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাফিজুল হক বলেন, কার্ড ছাড়া কাউকে চাল দেওয়ার সুযোগ নেই। যে পরিমাণ বরাদ্দ আছে, সেটাই বিতরণ করতে হবে। ৫ কেজি করে কম দেওয়ার বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু

Source: bartabazar.com

Back to top button