Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
Bd বাংলাদেশ

আওয়ামী মার্কা আলাপ সংসদে কেন!

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:

একটি জাতিকে যদি ক্রমাগতভাবে বলা যায়—‘তুমি তুচ্ছ, তোমার কোনো ঐতিহ্য নেই, কালচার নেই; তুমি গরিব, নিম্নবর্গ, শেয়ালের গর্তে বসবাস করতে তুমি; তুমি ছোট জাতের লোক,’ তখন একটু উচ্চবর্গে ওঠার জন্য, একটু জাতে ওঠার জন্য তারা প্রাণপাত করে দেয়।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল দক্ষিণ এশীয়দের ইঁদুর বলতেন; ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টরা পূর্ববঙ্গের মানুষকে ঠক-প্রতারক হিসেবে রিপোর্টে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। কলকাতার লেখক ও ব্রিটিশ চাকুরে বঙ্কিমচন্দ্র পূর্ববঙ্গের মুসলমানকে নিম্নবর্গের বলেছেন। ভারতের বিজেপির রাজনীতিক অমিত শাহ বাংলাদেশের মানুষকে উইপোকা বলেছেন। পাকিস্তান আমলে পাঞ্জাবের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে বেঁটে-কালো বলে তুচ্ছ করেছেন।

এর মানে এই নয় যে, ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট, বিজেপির নেতা বা পাঞ্জাবের শাসক বিরাট অভিজাত কোনো ব্যাপার। দক্ষিণ এশিয়া ছিল ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টদের পানিশমেন্ট পোস্টিং। বিজেপি বা পাঞ্জাবের শাসকদের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটিশের রেললাইনের ধারে বসে প্রাতঃক্রিয়া করতেন। ফলে হঠাৎ হাই কমোডে উঠে তাদের মধ্যে মেগালোম্যানিয়া তৈরি হয়। নিজের ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স লুকাতেই মানুষ সুপিরিয়রিটি প্রদর্শন করে।

পূর্ববঙ্গের মানুষেরা ব্রিটিশেরা আসার আগে পর্যন্ত সম্পন্ন কৃষক, কারিগর ও জেলের জীবনযাপন করত। মোগল আমলে বিশ্বের সর্বোচ্চ জিডিপি অর্জিত হয়েছিল; পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছে এই জিডিপির সিংহভাগ। একটি ইকোনমিক পাওয়ার হাউসে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি করে, কৃষকের জমি কেড়ে নিয়ে, কারিগরের আড়ং ভেঙে দিয়ে সেখানকার মানুষকে দুস্থ ও ভিক্ষুকে রূপান্তর করেছিল ব্রিটিশেরা।

সুলতানি আমলে বিকশিত বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও কালচারকে নিম্নবর্গের তকমা দিয়ে ব্রিটিশ পণ্ডিতেরা মৃতপ্রায় সংস্কৃত ভাষা থেকে শব্দসম্ভার এনে নতুন এক বাংলা ভাষা তৈরি করেন। সেখানে কালচারের বাংলা অনুবাদ করা হয় সংস্কৃতি হিসেবে। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কৃত শব্দসম্ভারে ভরা কৃত্রিম বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত করে সেটাকে ভদ্রলোকের ভাষা হিসেবে সুচিহ্নিত করা হয়। আর পূর্ববঙ্গের সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে ছোটলোকের ভাষার তকমা দেওয়া হয়। এভাবে যে কালচারাল হেজেমনি তৈরি হয়, তা পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে ভদ্রলোক হওয়ার তীব্র বাসনা তৈরি করে।

সেই তীব্র বাসনা থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের গঠন। গ্রামের কৃষকের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ভদ্রলোক হিসেবে বের হওয়ার আকাঙ্ক্ষা; ব্রিটিশ কলকাতার কৃত্রিম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ফুটসোলজার তৈরি হয় অসংখ্য। এরা বঙ্কিমচন্দ্রের ভঙ্গিতে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষকে নিম্নবর্গের বলে বিশ্বাস করতে থাকে। কলকাতার মানভাষা ও কালচার যেহেতু সাহিত্যে ‘বাঙালি বনাম মুসলমানের ফুটবল’ খেলার বর্ণনা দেয়; ফলে ঢাকায় বাঙালি স্বীকৃতি পাওয়ার ইঁদুরদৌড়ে হিন্দুধর্মের রিচুয়াল কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজ আর ইসলাম ধর্মের রিচুয়ালকে অ্যান্টি-কালচার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের রক্ত ত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সম্মুখসমরের যোদ্ধা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে ফিরে যায়। আর কলকাতায় যুদ্ধের সময় বিশুদ্ধ ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরা মানুষেরা যুদ্ধজয়ী ভদ্রলোক হিসেবে ফেরেন। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কিন্তু সম্মুখসমরে বীরোচিত অংশগ্রহণ তেমন নেই—এমন যুদ্ধজয়ী বীরেরা নতুন অভিজাত সমাজ তৈরির প্রত্যয় নিয়ে ফেরেন।

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার বাইরের শহীদ পরিবার, শরণার্থী পরিবার এবং যুদ্ধে পুড়ে যাওয়া গৃহের গ্রাউন্ড জিরোতে দাঁড়ানো মানুষের জীবনসংগ্রাম শুরু হয়। যুদ্ধাহত রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি সামর্থ্যের অভাবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ‘উচ্চবর্গে’র সনদ বানিয়ে ঢাকায় শুরু হয় যুদ্ধে ভারত ও পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু ও অবাঙালিদের বাড়ি দখল করে নতুন অ্যারিস্টোক্র্যাসির যাত্রা। ছাপরা ঘর থেকে বেরিয়ে বাংলোয় উঠে নতুন জমিদারের ভঙ্গিতে জীবন কাটাতে শুরু করে এরা। বঙ্গবন্ধু এদের ‘চাটার দল’ ও ‘চোরের খনি’ বলে আক্ষেপ করেছিলেন।

হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতিতে যেভাবে জন্ম থেকে নির্ধারিত হয়, ‘কে ব্রাহ্মণ, কে শূদ্র’—বাংলাদেশের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ঠিক ওইভাবে ঠিক করে দিতে চায়, ‘কে ব্রাহ্মণ, কে শূদ্র।’ কলকাতা ও ঢাকার এই আর্যবলয় খুব কনভিন্সিং নয়; কারণ আর্যের দৈহিক গঠন ও মস্তিষ্কের আয়তন তার বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে। কিন্তু কলকাতা ও ঢাকায় বেগুনি মুখমণ্ডল, ছোট কাঁধ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দেহবল্লরি-কল্পিত আভিজাত্য প্রকাশ করে না। অবশ্য ফ্রিডরিখ নিৎসের এই আর্য ধারণা সাম্যভিত্তিক সুস্থ সমাজে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান জুলাই বিপ্লবের তরুণ-তরুণীদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘কই থিকা আইলো এরা, ঘর নাই দুয়ার নাই, বইসা খাওনের জায়গা নাই।’ আমাদের সমাজে অবলীলায় এমন রেসিস্ট মন্তব্য করা যায়। কারণ ফজলুর রহমান শৈশব থেকে গাত্রবর্ণের কারণে রেসিজমের ভিক্টিম হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আভিজাত্যের উত্তরীয় পরে তিনি এখন অন্যদের প্রতি রেসিজম প্রকাশ করছেন। সমাজ চক্রাকারে এমন প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে ঘোরে।

সংসদ সদস্য আন্দালিব পার্থ শৈশব থেকে তার বাবা এরশাদের দোসর, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, অধুনা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার আত্মীয় ইত্যাদি কারণে সমাজের বিভিন্ন স্টিগমার ভিক্টিম। এ কারণেই তিনি উইনস্টন চার্চিলকে উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি হয়তো ড্রাঙ্ক পরে সোবার হয়ে যাবেন; কিন্তু তার প্রতিপক্ষ কুৎসিত, ফলে কুৎসিতই থেকে যাবে। এটা তো ঠিকই—খর্বকায় লোকেরা সবসময় খর্বকায় থেকে যায়।

শেখ হাসিনার বাংলা ও ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি ছিল। তাছাড়া আমাদের সমাজের যে তুলনামূলক আলোচনা, সেখানে খালেদা জিয়া ছিলেন প্যারাগন অব বিউটি। এজন্য শেখ হাসিনা রেগে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আভিজাত্য কুক্ষিগত করতে জিয়া ও খালেদা জিয়াকে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি বানিয়ে দিয়েছিলেন।

বিএনপির যে মুক্তিযোদ্ধারা, তারা আওয়ামী লীগের ডিফেমেশনে সবসময় ‘স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি’ তকমায় জর্জরিত হয়েছেন; ফলে ক্ষমতায় এসেই তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আভিজাত্যের উত্তরীয় পরে আওয়ামী লীগের ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে ধমকাচ্ছেন।

যত্রতত্র যাকে-তাকে ‘রাজাকার’ ডেকে শেখ হাসিনা ও তার খুনের দোসরেরা আজ দেশছাড়া। কিন্তু নিয়তি সেরকম পরিণতির দিকে ডাকছে বলেই হয়তো বিএনপি আজ আওয়ামী লীগের চরিত্রে অভিনয় করছে।

১৯৭১ সালে নির্দিষ্টসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার ছিলেন; সেই প্রজন্মের বেশিরভাগই দেহ রেখেছেন, বাকিরাও টিকবেন খুব অল্প সময়। কিন্তু আজ ও আগামীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ—জেন এক্স, মিলেনিয়াল, জেন জি ও জেন আলফার পক্ষে কোনোভাবেই মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার হওয়া সম্ভব নয়।

বর্তমানের মানুষের মধ্যে জুলাইয়ের ফ্যাসিস্টবিরোধী বিপ্লবী, সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াকু সৈনিক আছে; আর আছে ২০০৯-২৪-এর ৫ আগস্ট পর্যন্ত হত্যা-ক্রসফায়ার-আয়নাঘর-দেশলুণ্ঠনের অনুশোচনাহীন অপরাধী আর তাদের অন্ধ সমর্থকেরা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চুইংগাম চিবিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার হত্যা করে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাকে রাজাকার হিসেবে তকমা দিয়ে জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটিতে মালিন্য আনা হয়েছে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার পূর্ণ করতে চাইলে তাদের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে দেখাতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্যদের দিয়ে বিরোধী দলকে হাসিনা স্টাইলে গালাগাল করিয়ে, কিংবা শেখ হাসিনার কটাক্ষের স্বাদ পেতে তার আত্মীয়কে দিয়ে ‘গোপালগঞ্জের’ অঙ্গভঙ্গি করিয়ে লাভ নেই।

জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৫-২০ বছরের মধ্যে কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করেছিল। আর বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও ব্যর্থ অকল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে রয়ে যাওয়ার জন্য আজ ও আগামীর প্রজন্ম ৫৫ বছরের শাসক আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতকেই দায়ী করবে। ৫৫ বছরে যারা এই দলগুলোর সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন, নেতা হিসেবে জীবনযাপন করেছেন, তারা দেশকে কতটুকু দিয়েছেন আর কতটুকু নিয়েছেন, সে হিসাব বাংলাদেশের জনগণের কাছে রয়েছে।

প্রোগ্রেস রিপোর্টে যাদের ফলাফলে ‘অকৃতকার্য’ লেখা, তারা এত কেশর ফুলিয়ে কথা বলবেন কেন? বিএনপি-জামায়াত দম্পতি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোথায় কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, তা হিসাব কষে বলে দেওয়া যাবে। কাজেই এখন সরকারি ও বিরোধী দলে বিভক্ত হয়ে পাবলিকলি দাম্পত্য কলহ করে সংসদের কর্মঘণ্টার অপচয় কেন করতে হবে? এসব বেডরুমে গিয়ে করা উচিত। এসব ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ বা ‘BAL’ মার্কা আলাপ জনগণের টাকা খরচ করে সংসদে কেন!

লেখক : সাংবাদিক

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু

Source: dailyamardesh.com

Leave a Reply

Back to top button