ইরানকে কাবু করতে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র, কষ্ট বাড়াচ্ছে অতীত স্মৃতি

ইরানের সঙ্গে চলমান প্রায় পাঁচ মাসের যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশ্বাসে অটল রয়েছেন। তার ধারণা, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানকে যথেষ্ট শক্ত আঘাত করলে দেশটির নেতারা শেষ পর্যন্ত তার শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবেন। তবে ট্রাম্পের এই রণকৌশল মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং অতীতের যুদ্ধগুলোর অমীমাংসিত ইতিহাস সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান আলোচনায় না বসলে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেব।’
ইরানিরা চুক্তি করতে আগ্রহী কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।’
অতীতের যুদ্ধের শিক্ষা ও পেন্টাগনের বিতর্ক
নব্বইয়ের দশকের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের পর নিখুঁত অস্ত্রের বহুমুখী হামলা দিয়ে শত্রুকে দ্রুত পরাস্ত করার যে রণকৌশল তৈরি হয়েছিল, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে তা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। ২০০৭ সাল নাগাদ মার্কিন সেনাবাহিনীর নতুন নীতিতে বলা হয়—ভুলভাবে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করলে শুধু শত্রুর সংখ্যাই বাড়ে। কখনো কখনো কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াই সেরা প্রতিক্রিয়া। বর্তমানে আমেরিকার এই বিশাল সামরিক শক্তির সঠিক ব্যবহার নিয়ে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের মধ্যে একই বিতর্ক চলছে।
হামলার তীব্রতা ও ইরানের প্রতিরোধ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ৩৮ দিনের প্রাথমিক সামরিক অভিযানে তেহরানের একটি কম্পাউন্ডে ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা নিহত হন।
পেন্টাগনের দাবি, তারা প্রায় ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী ধ্বংস করেছে।
গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও চুক্তি স্বাক্ষরে ব্যর্থ হয়ে চলতি মাসে তা ভেঙে যায় এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, নতুন দফার হামলা আরো মারাত্মক হবে।
কিন্তু দুই শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইরান ইতোমধ্যে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করে ফেলেছে। চলতি মাসে মার্কিন যুদ্ধবিমান যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে, তার বেশিরভাগই গত ফেব্রুয়ারিতেও আক্রান্ত হয়েছিল।
বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি ও আইনি শঙ্কা
চলতি মাসে হামলা মূলত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে উত্তর-পূর্ব ইরানে একটি রেলসেতুতেও মার্কিন বাহিনী আঘাত করেছে, যা দিয়ে প্রণালিতে অস্ত্র পরিবহন করা হতো বলে দাবি পেন্টাগনের।
প্রণালির কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কমে আসায় ট্রাম্প এখন ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তবে এই ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল কি না, তা নিয়ে পেন্টাগনের ভেতরেই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নেতৃত্বশূন্যতার সংকট ও বিশেষজ্ঞদের মত
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস. ক্লিনটন হিনোট বলেন, ‘নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান কাজ করলেও তা সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনে না। শত্রুর মস্তিষ্ক অচল হলেও তার শরীর আগের মতোই লড়াই চালিয়ে যায়।’
তিনি জানান, শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন এমন এক ক্ষুব্ধ ও অনমনীয় ইরানি নেতৃত্বের মুখোমুখি, যারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে কিছু অত্যন্ত ‘খারাপ লোক’ রয়েছে, যারা চুক্তি হতে দিচ্ছে না।
অন্যদিকে, নব্বইয়ের দশকের যুদ্ধকৌশলের প্রণেতা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভিড ডেপ্টুলা মনে করেন, ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর সুনির্দিষ্ট ও তীব্র বিমান হামলা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দিতে পারে।
তার মতে, সামরিক পদক্ষেপকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে জুড়তে হবে এবং তা বজায় রাখতে হবে। মাঝেমধ্যে হামলা থামানো বা দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দিলে ইরান সামলে ওঠার সুযোগ পায়।
তবে জেনারেল হিনোট এই তত্ত্বের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, অতিরিক্ত বোমা ফেলেও ইরানের কাছ থেকে নতুন কোনো ছাড় পাওয়া যাবে না। ২০০১ সালে তালেবান এবং ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে ধ্বংস করেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সেই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি বিজয়ে রূপান্তর করতে পারেননি। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এএম
source: Daily Amar Desh

