উপকূলজুড়ে দুর্যোগের ঘনঘটা, বার্তাবাহকের পূর্বাভাসে বিভ্রান্তি

আকাশের মেঘ দেখে বৃষ্টির দিন গোনার রেওয়াজ এ দেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু শ্রাবণের সেই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি যখন আবহাওয়া দপ্তরের লাল খাতার হিসাব মিলিয়ে ঝরতে ভুলে যায়, তখন বৃষ্টির বার্তার চেয়ে বার্তাবাহকের ভূমিকার সঠিকতা নিয়েই উঠে হাজারও প্রশ্ন।
সতর্ক সংকেত যখন বাস্তবে রূপ নেয় না, তখন সাধারণ মানুষের সংশয়ের মেঘ গাঢ় হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশের সাত বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস আগের দিন জারি করা হলেও, মঙ্গলবার দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত দেশের কোথাও মিলল না সেই পূর্বাভাসের ভারীবৃষ্টি। ভুল পূর্বাভাসের এই অনাকাঙ্খিত নাট্যমঞ্চ ঘিরে আবহাওয়াবিদদের কণ্ঠে এখন স্বীকারোক্তির সুর— এ যেন এক ‘বড় ধরনের মিসটেক’।
একদিন আগেই আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুকের স্বাক্ষরে ভেসে এসেছিল এক শঙ্কার বার্তা। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর দাপটে দেশের সাতটি বিভাগে—রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটে—ঝরবে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি। রাজধানীর বুকে সাময়িক জলাবদ্ধতার শঙ্কাও জাগিয়ে রাখা হয়েছিল সেই সতর্কবার্তায়। কিন্তু বাস্তবতার ক্যানভাসে চিত্রটা ফুটল একেবারে ভিন্নভাবে। ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের খতিয়ান পর্যালোচনায় দেখা গেল, সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে মঙ্গবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় দেশের কোথাও ভারী বা অতি ভারী বর্ষণ হয়নি।
আবহাওয়া দপ্তরের বৃষ্টিপাত স্কেলে যেখানে ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিকে ‘ভারী’ এবং তার বেশি হলে ‘অতি ভারী’ হিসেবে ধরা হয়, সেখানে মঙ্গলবার গোটা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে গোপালগঞ্জে—মাত্র ৩৬ মিলিমিটার। আর জলাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় থাকা রাজধানী ঢাকা যেন দেখা পেল কেবল এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া; মেপে দেখা গেল মাত্র ৭ মিলিমিটার। মেঘের সঙ্গে যেন বৃষ্টির এক অধরা লুকোচুরি খেলা চলল সারাদিন, আর সেই খেলায় ভুল সংকেত দিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াল খোদ আবহাওয়া দপ্তর।
জলবায়ুর এই জটিল খেলায় ভুল বার্তার পেছনের রহস্য উন্মোচন করেছেন স্বয়ং আবহাওয়াবিদরা। রাতে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির আমার দেশকে বলেন, পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের অপ্রতুলতা ও তথ্য পাওয়ার দুর্বলতাই এই বিভ্রাটের মূল কারণ।
তিনি বলেন, রংপুর থেকে বগুড়া—দুইটি স্টেশনের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। অথচ এই বিশাল এলাকার মাঝখানে কোনো পর্যবেক্ষণ স্টেশন নেই। সারাদেশেই এমন শূন্যতা। পর্যাপ্ত ডাটা না পেলে পূর্বাভাসে সূক্ষ্মতা আনা কঠিন।
কেবল তা-ই নয়, রাডার ব্যবস্থার জরাজীর্ণ অবস্থাও সামনে এসেছে। দেশের পাঁচটি রাডারের মধ্যে তিনটিই দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি বিকল। সম্প্রতি কেবল ঢাকা ও রংপুরের রাডার দুটি সচল করা হলেও, বাকি তিনটি রাডার এখন জাইকার পুনঃস্থাপনের প্রতীক্ষায় নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির এই দৈন্যদশার কারণেই সোমবারের ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তাটি এক বড় ‘মিসটেক’ বা ভুলের খাতায় নাম লিখিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
ভুলের বোঝা কাঁধে নিয়েই ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই আগের সতর্কবার্তা তুলে নিয়ে নতুন বার্তা জারি করেছে আবহাওয়া দপ্তর। এবার পূর্বাভাসের কেন্দ্রবিন্দু থেকে বাদ পড়েছে উত্তরের বিশাল এলাকা। নতুন হিসাব বলছে, উত্তরপ্রান্তে বৃষ্টির তেজ কমলেও আগামী দুদিন মূলত দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় ঘনিয়ে আসবে মেঘের ঘনঘটা।
ড. ওমর ফারুকের সই করা নতুন সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। পাহাড়ি জনপদ চট্টগ্রামে তাই জারি রয়েছে ভূমি ধসে পড়ার এক অজানা আতঙ্ক। বিশেষ করে পর্যটননগরী কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা জাগছে। এর প্রভাবে রাজধানী ঢাকাতেও বৃষ্টিপাতের মাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে।
বর্তমানে মৌসুমি বায়ুর অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর একটি বর্ধিতাংশ ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পূর্ণ সক্রিয় এবং অন্যত্র মোটামুটি সক্রিয় রূপ ধারণ করে আছে।
যার প্রভাবে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ স্থানে এবং দেশের অন্যান্য বিভাগের অনেক জায়গায় বইতে পারে অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি। মঙ্গলবার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সর্বোচ্চ ৩৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং ঢাকায় ৩৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উষ্ণতার মাঝেও আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে—পূর্বাভাসে বিভ্রান্তি যতই থাকুক না কেন, চলতি সপ্তাহজুড়েই থেমে থেমে সারাদেশেই অব্যাহত থাকবে এই বৃষ্টির আনাগোনা।
মেঘ আর বৃষ্টির এই অসম কাব্যে পূর্বাভাসের হিসাব মিলুক আর না-ই মিলুক, প্রকৃতির আপন নিয়মে শ্রাবণের এই বৃষ্টিধারা বইতেই থাকবে সারাদেশে।
source: Daily Amar Desh

