চুপ্পুকে ঘিরে যত বিতর্ক

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের—তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পর্বের শীর্ষ নেতৃত্বকে শপথ পড়িয়েছেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত সময়জুড়ে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার রাষ্ট্রপতি অধ্যায়।
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের দায়িত্বে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে তার পক্ষে অবস্থান নেয় বিএনপি। সে সময় তাকে অপসারণের উদ্যোগ সফল হয়নি। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন।
নির্বাচনের কয়েকদিন পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কঠিন সময়ে বিএনপি এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিল। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তিনি আন্তরিক ব্যক্তি বলেও উল্লেখ করেন। তবে সময়ের সঙ্গে বঙ্গভবন ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকেই তাকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক পরিচয় ও আইনি বিতর্ক
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এর আগে তার নাম ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্রলীগের মাধ্যমে। তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সভাপতি এবং পরে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় তিন বছর কারাবন্দিও ছিলেন।
এই রাজনৈতিক অতীতের কারণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কমিশনার হওয়ায় তার রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ নিয়েও আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়। যদিও উচ্চ আদালত রায়ে রাষ্ট্রপতির পদকে ‘লাভজনক পদ’ নয় উল্লেখ করে তার নিয়োগের বৈধতা বহাল রাখেন।
শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বিতর্ক
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু কিছুদিন পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তার সমালোচনা করেন। এমনকি বঙ্গভবন ঘেরাও ও তার পদত্যাগের দাবিও ওঠে। পরে বঙ্গভবন থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আচরণে তিনি নিজেকে ‘অপমানিত’ মনে করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সাত মাস প্রধান উপদেষ্টা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। রাষ্ট্রপতির প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো থেকে তার প্রতিকৃতিও অপসারণ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং আইনি প্রশ্নের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন শেষে বিএনপি সরকারের আমলেই পদত্যাগের মাধ্যমে বঙ্গভবনের অধ্যায়ের ইতি টানলেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
source: Azadir Dak

