জুলাই দিবসে ‘মেসেজ’ পাঠানো নিয়ে ব্যাখ্যা দিলেন নাহিদ ইসলাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতা-কর্মীদের আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, জুলাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন। রাজনীতির বাইরে থাকা মানুষ, ‘আই হেট পলিটিক্স’ মানসিকতার মানুষ, সুইং ভোটার, শ্রমজীবী ও শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। আর সেই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে বার্তা (মেসেজ) পাঠিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা বলেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, সবাইকে জুলাই বিপ্লবের শুভেচ্ছা। শহীদ কর্নেল গুলজার, শহীদ রেহান আহসান, শহীদ আবরার ফাহাদ, শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ তাহির জামান প্রিয়, শহীদ রিয়া গোপ, শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর রক্ত-ঘামে অর্জিত এই আজাদী আশা করি সবাই উপভোগ করছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই একটা জিনিস ভাবছিলাম। জুলাইয়ে আমার জন্য দোয়া করেছিল, আমার জন্য স্ট্যাটাস দিয়েছিল, আমার মুক্তির জন্য গান গেয়েছিল, ছবি এঁকেছিল এমন অনেক মানুষ যাদেরকে আমি চিনি না। রাস্তায় পানির বোতল এগিয়ে দেয়া খুদে ব্যবসায়ী, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া রিকশা-ভ্যান চালক, পুলিশের চোখ এড়িয়ে হাসপাতালে আহত ভাইদের চিকিৎসা দেওয়া ডাক্তার, এমন অনেক মানুষ যাদের আমি চিনি না। যেই ছেলেটা প্লেস্টেশন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির বাইরে কিছু বোঝে না, যে মেয়েটার জীবন কিয়োশি থেকে ক্রিমসন কাপ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, যারা কখনো সরকারি চাকরি করার কথাই ভাবেনি, বিএএফ শাহীন কলেজের যেই শহীদ আহনাফের ছাত্র রাজনীতি করারও বয়স হয় নাই, সেই ছেলেমেয়েরা জুলাইয়ে আবাবিল পাখির মত নেমে এসে আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছে।
‘কিন্তু জুলাইয়ের পর এদের বেশিরভাগই ঘরে ফিরে গেছে। তারা কোন রাজনৈতিক দলেই নাই। জুলাইকে আমরা রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভাগবটোয়ারা করে ফেলেছি। বিএনপির ভাগ কত, এনসিপির ভাগ কত, জামাতের ভাগ কত- এভাবেই জুলাইয়ের স্টেক ভাগাভাগি হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু জুলাই তো শুধু রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ছিল না। জুলাই ছিল সর্বস্তরের সব মানুষের। এপলিটিকাল জনগোষ্ঠীর। আই হেট পলিটিক্স জনগোষ্ঠীর। সুইং ভোটার জনগোষ্ঠীর। সবার। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া জুলাই কখনো সফল হতো না। অথচ কাউকেই এখন আর মিছিল-মিটিঙে পাওয়া যায় না। সভা-সেমিনারে পাওয়া যায় না। কোন সংবর্ধনার আয়োজন করলেও তারা আসেন না। তারা ঘরেই থাকেন।’
স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের পর একদম খালি হাতে ঘরে ফিরে যাওয়া এই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য কি করা যায় সেটা নিয়ে ভাবছিলাম। সেই ভাবনা থেকেই গত দুই দিন যতটা সম্ভব কৃতজ্ঞতা বার্তা পাঠিয়েছি। অনেকেই হয়ত আমার সেই ম্যাসেজ পেয়েছেন। আবার অনেকেই স্প্যাম ফোল্ডারে ম্যাসেজটা চলে যাওয়ার জন্য হয়ত খেয়াল করেন নাই। আবার অনেকের ম্যাসেজ অপশন বন্ধ থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ম্যাসেজ করতে পারি নাই।
তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা বাংলাদেশের ষোল কোটি বিপ্লবীকেই টেক্সট করা, তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করা, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। কিন্তু মানবিক সীমার কারণে চাইলেও সবার সাথে যোগাযোগ করা সঙ্গত কারণেই সম্ভব না। আমি এজন্য সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। অগনিত মা, দাদী, নানী, বোন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রেমিট্যান্স যোদ্ধা, শ্রমিক, আলেম, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী, সৈনিক, সেনা কর্মকর্তা, মাদ্রাসার ছাত্র, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এক্সপ্যাট, পেশাজীবী জুলাইয়ের মালিক। জুলাইয়ের রচয়িতা। তাদের সবাইকে আমি ম্যাসেজ পাঠাতে পারি নাই। তবে আপনাদের প্রত্যেককে আমি ফিল করি। যারা যারা আমার ম্যাসেজ পান নাই তাদের সবার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু নিশ্চিত থাকুন, আমি আপনাদের ভুলে যাই নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাইয়ের পর আমাদের বহু স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। আপনাদের প্রত্যাশার পরিবর্তনও এখনো অনেক দূরে। আমি স্বীকার করছি, আমাদের প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে বিশ্বাস করুন, আমরা চেষ্টা করেছি। বহুপক্ষীয় বাধার কারণে অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমরা আমৃত্যু নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জারি রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন। আপনাদের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাধ্যমতো চেষ্টা করুন। দেশ- জাতির যেকোনো প্রয়োজনে আপনারা আবারও সরব হবেন। জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখবেন।’
source: The Daily Campus