হাসিনাকাণ্ডে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন ক্ষত

বাংলাদেশে নির্বাচিত নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে আসছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ঢাকায় এসে পারস্পরিক সম্পর্কে দূরত্ব কমানোর বার্তা দেওয়া ইত্যাদি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির দ্বিচারিতায় নতুন করে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার পতন এবং পলায়নের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে তাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে ক্ষত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরেই নানা চড়াই-উতরাই ও আস্থার সংকট চলে আসছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, তা যেন এক স্থায়ী অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যেই আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। এই আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বরফ গলবে এবং সম্পর্কের দূরত্ব কমবে—এমন প্রত্যাশা কূটনৈতিক মহলে তৈরি হলেও, ঠিক তার প্রাক্কালে দিল্লির মাটিতে বসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক বক্তব্য দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে গভীর ক্ষত ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারত সরকার দেশটির সংসদীয় কমিটিকে জানায়, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ তার দেশে ফেরার সাম্প্রতিক ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান জানায় ভারত সরকার। দেশটির সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্রবিষয়ক ওই সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, ‘হাসিনার বিরুদ্ধে ঢাকার পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধটি প্রাসঙ্গিক আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে দেখছে।’ একদিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়া, দিল্লির এ দ্বিমুখী ভূমিকায় ঢাকা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেটিই প্রকাশ পেয়েছে গত বুধবার দেওয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে। বিবৃতিতে বেশ কড়া ভাষাই ব্যবহার করেছে ঢাকা।
এদিকে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদও শেখ হাসিনাকে প্রশ্রয় দেওয়ায় ভারতের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে দেশটির সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিল, সেটা তার সরকারের প্রশ্ন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হল।
বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে
নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সরাসরি সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রাতে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পলাতক ও আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যার আসামি হাসিনা ও তার অনুচরেরা এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই অনুষ্ঠান আয়োজনের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আগেভাগেই ভারত সরকারকে অবহিত করা হয়েছিল, এরপরও তা অনুষ্ঠিত হতে দেওয়ায় ঢাকা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে।
মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, বাংলাদেশ যখন জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, সেদিনই ভারতের মাটিতে হাসিনার এই বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সত্য—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিরীহ নাগরিক ও শিশুসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তথ্য— অস্বীকারের এই প্রচেষ্টা ইতিহাসের গতিপথ পাল্টানোর ব্যর্থ প্রয়াস। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, অতীতেও দেশের জনগণ এ ধরনের অপচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে, এখনো করছে।
জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশকে কখনো কোনো রাষ্ট্রের করদ রাষ্ট্রে পরিণত করতে না দেওয়ার ব্যাপারে জনগণ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বলে জানায় মন্ত্রণালয়। দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার অপরাধী চক্রের বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনো স্থান নেই বলেও স্পষ্ট করা হয় বিবৃতিতে।
সবশেষে বিবৃতিতে বলা হয়, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ। তবে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ভারতের কোনো সাড়া মেলেনি বলে হতাশা প্রকাশ করা হয়। উল্টো তাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া দুদেশের সুসম্পর্ক উন্নয়নে ক্ষতিকর ও বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাতকারী বলে মন্তব্য করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রশংসায় ভাসছে সরকার
এদিকে কড়া ভাষায় বিবৃতির মাধ্যমে দিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে প্রশংসায় ভাসছে তারেক রহমান সরকার। গতকাল দিনভর ফেসবুকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি শেয়ার করে সময়োপযোগী সাহসী প্রতিবাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। অনেকে লেখেন, ড. ইউনূসের সরকার যেভাবে ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে, তারেক রহমান সরকারও এবার সেভাবে দেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানেরও প্রশংসা করেন অনেকে।
এক অনিশ্চিত সমীকরণ
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথি বা আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল ভারতের পক্ষ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিক বহুপক্ষীয় আমন্ত্রণ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলো দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের চমৎকার সুযোগ তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সফরটি হতে পারত একটি টার্নিং পয়েন্ট। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সম্মেলনে যোগদান নিয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একদিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, অন্যদিকে ভারতের ভূখণ্ডে বসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী ও বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও উসকানিমূলক তৎপরতা বন্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ঢাকার নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। ফলে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণ নিয়ে কূটনৈতিক দরকষাকষি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, দিল্লির দ্বিচারিতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরক্ত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারতে যাওয়ার পরামর্শে এসেছিল সরকারি দলের কোনো কোনো নেতার পক্ষ থেকে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশকারা দেওয়াসহ পুশইন, অব্যাহত সীমান্ত হত্যা ও অন্যান্য কারণে তারেক রহমান প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেন। একই সঙ্গে তিনি চীনও সফর করেন। এরপরই দিল্লি সফরের বিষয়টি বিবেচনায় রাখলেও মোদি সরকারের আচরণ পর্যবেক্ষণে রেখেছেন তিনি।
দিল্লির সংবাদ সম্মেলন ও নতুন কূটনৈতিক ক্ষত
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যখন এই নাজুক অবস্থা চলছে, ঠিক তখনই গত ৫ আগস্ট—যা ছিল ২০২৪ সালের পটপরিবর্তন ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দ্বিতীয় বার্ষিকী—নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়াতে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন সেখানে আশ্রিত শেখ হাসিনা। দীর্ঘ দুই বছর নির্বাসনে থাকার পর এটিই ছিল তার প্রথম কোনো বড় প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে বক্তব্য প্রদান। যদিও প্রথমে সশরীরে উপস্থিতি কিংবা ভিডিও বক্তব্যের কথা প্রচার করা হয়েছিল। তবে পরে অডিও বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিতে দেখা গেছে।
ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে একটি ‘সংগঠিত রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে আখ্যায়িত করেন। শুধু তাই নয়, তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আসার জোরালো ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বর্তমান সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, গ্রেপ্তার বা কারাবাসের ভয় দেখিয়ে তাকে থামানো যাবে না। একই সঙ্গে তিনি তার দল আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
দিল্লির মাটিতে দাঁড়িয়ে পলাতক কোনো সাবেক সরকারপ্রধানের এমন রাজনৈতিক উসকানিমূলক বক্তব্য এবং দেশে ফিরে বিশৃঙ্খলা তৈরির আহ্বান ঢাকা ভালোভাবে নেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগে থেকেই এই আয়োজনের সঙ্গে নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও কূটনৈতিক প্রটোকল লঙ্ঘন করে ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকে বাংলাদেশ সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে এবং আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অতীতের তিক্ততা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পারস্পরিক আস্থাহীনতা ও টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। গত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দুই দেশের সম্পর্ক এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছেছিল বলে দাবি করা হলেও, সাধারণ জনগণের মনে তা নিয়ে সবসময়ই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল। সমালোচকদের মতে, ওই সময়ে ভারতের একপক্ষীয় তোষণ নীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনৈতিক হস্তক্ষেপ দেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া, সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া এবং বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার বহু নজির রয়েছে। ট্রানজিট ও করিডোর দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যখন ছাত্র-জনতার রক্তে অর্জিত বিজয়ের মাধ্যমে দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়, তখনো পতিত স্বৈরাচারকে ভারতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি এ দেশের মানুষ সহজভাবে নেয়নি।
অতীতেও দেখা গেছে, যখনই বাংলাদেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন এসেছে, তখনই দিল্লির নীতিনির্ধারকরা একধরনের আধিপত্যবাদী মনোভাব প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল যে পারস্পরিক সমতা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের শ্রদ্ধা—তা বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে।
বাংলাদেশের জনআকাঙ্ক্ষা
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষ কোনো ধরনের আধিপত্য বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আর মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। দেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো—সবাই একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সমতার ভিত্তিতে রচিত পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে সোচ্চার। ভারত যদি সত্যিই এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়, তবে তাদের বুঝতে হবে, কোনো একক ব্যক্তি বা দলের তোষণ নয়, বরং এ দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানোই কূটনীতির সবচেয়ে বড় শর্ত।
শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ দেওয়া বন্ধ না করলে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়বেই। এ পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগদান করা বা না করার বিষয়টি এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে ভারতের আন্তরিকতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতি তাদের আস্থার প্রমাণের ওপর।
দণ্ডিত হাসিনা নাকি বাংলাদেশ, সিদ্ধান্ত ভারতের
ভারতে শেখ হাসিনাকে নীতিবহির্ভূতভাবে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে দেওয়ার ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাওজুল কবির খান। ভারতের এমন নীতির বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দেওয়া ঢাকার বিবৃতিকে যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবভিত্তিক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের সামনে এখন একটি সহজ পথ রয়েছে। হয় তারা বাংলাদেশের জনগণকে অথবা আইনের হাত থেকে পলাতক ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে বেছে নেবে। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে কোনটিকে বেছে নেবে। দুটিকে একসঙ্গে বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনদিকে যাবে, সে বিষয়ে ভারতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় গতকাল সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হোক, সেটা দুই দেশের জনগণ আর সরকার চায় বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। কিন্তু ভারতের মাটিতে বসে স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের লোকজন ও প্রধান যদি এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে আর সেটা যদি ভারত সরকার এই মুহূর্তে বন্ধ না করে, তাহলে অবশ্যই সেটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি উদ্বেগের জায়গা তৈরি করে।
দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং নানা ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটা ভারতকে এখন নিতে হবে। তারা স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, সাজাপ্রাপ্তদের বক্তব্য দিতে দেবে কি না, এ সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে।
জেডএম
source: Daily Amar Desh