News

ছুটির দিনে সড়কে ঝরল ১৮ প্রাণ

দেশের সড়কপথে দুর্ঘটনা ও হতাহতের হার বাড়ছেই। শুক্রবার ছুটির দিনে দেশের দুই মহাসড়কে পৃথক বাস ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৮ জন। এর মধ্যে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ যাত্রী, বগুড়ার সদর উপজেলায় বাসচাপায় সাত শ্রমিক এবং একই উপজেলায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দম্পতি নিহত হন। তিন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে তিন হাজার ৭৫২টি। এতে নিহত হয়েছে তিন হাজার ৩৮৭ জন। এর মধ্যে ২৩২ জন বাসযাত্রী। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে সাত হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে সাত হাজার ৩৫৯ জন, আহত হয়েছে ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। ২০২৪ সালে দেশে ছয় হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২৯৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৯ জন আহত হয়। সে হিসাবে গত বছর দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে গত বছরের ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ওই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত ও এক লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন আহত হয়েছে।

ওসমানীনগরে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ৯

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে শুক্রবার দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাউলশিল্পী ও শিশুসহ ৯ জন নিহত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ২৫-৩০ জন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।

শুক্রবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দিনের শুরুতেই ঘটে যাওয়া এ ভয়াবহ সংঘর্ষে মুহূর্তেই থেমে যায় অন্তত ৯ প্রাণ।

ওসমানীনগর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দুর্ঘটনার পর থানা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। নিহতরা সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী। আহতদের বেশিরভাগও একই বাসের যাত্রী। অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বাস জব্দ করে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, কেউ কর্মস্থলের উদ্দেশে, কেউ চিকিৎসার জন্য, আবার কেউ প্রিয়জনের কাছে ফিরছিলেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের সে বিভীষিকাময় সংঘর্ষে সবকিছু বদলে যায়। স্বজন হারানোর আহাজারি, আহতদের আর্তনাদ ও রক্তাক্ত দৃশ্যে ভারী হয়ে ওঠে পুরো কাশিকাপন এলাকা ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক।

দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরীনা লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৫০) ও কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের সাফি মিয়াসহ কয়েকজন নিহত হন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা বিক্রমপুরের জাহাঙ্গীর শেখের তিন বছর বয়সি কন্যা জাইফা ইসলাম (৩) ও সিলেট নগরের সোবহানিঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতমকে (২২) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। সর্বশেষ আরো একজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ জনে ।

সড়ক দুর্ঘটনা

এ ঘটনায় নুরুন নাহার (২৪), মফিজ মিয়া (২৯), ফারুক মিয়া (২৯), মুক্তার (২৯), জাহাঙ্গীর (৩০), আফরোজা (২৯), আফজাল, বাবুলসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ওসমানীনগর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (তাজপুর) স্টেশনের স্টেশন অফিসার অপু মিয়া জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন এবং আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান।

বগুড়ায় সাত শ্রমিকের মৃত্যু

বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের এরুলিয়া বাজারে বাসের চাপায় সাতজন দিনমজুর নিহত এবং অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছে। শুক্রবার ভোরে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, ঢাকা থেকে বগুড়া হয়ে নওগাঁগামী এসি কোচ শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি কোচ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এরুলিয়া বাজারে আগে থেকেই অবস্থানরত দিনমজুর শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন এবং ১৭ জন গুরুতর আহত হন। এদের মধ্য চারজন মেডিকেল কলেজে মৃত্যুবরণ করে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। নিহতদের চারজনের পরিচয় পুলিশ শনাক্ত করেছে। তারা হলোÑগাইবান্ধার আমিরুল, নুর আলম, বেলাল ও জয়পুরহাটের তাইমু। স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরো চারজনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় ওই এলাকার বিক্ষুব্ধ জনগণ চার ঘণ্টা মহাসড়কটি অবরোধ করে রাখে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়কে স্পিড ব্রেকার না থাকায় এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। পরে সাড়ে ১০টার পর প্রশাসনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় এ সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। জেলা প্রশাসন নিহতদের জন্য ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের পরিবারের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী এবং উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জালাল উদ্দিন জানান, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে স্পিড ব্রেকার নির্মাণের আশ্বাস দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা অবরোধ তুলে নেয় এবং যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়।

বগুড়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াজেদ জানান, দুর্ঘটনার খবরটি শোনার পরই ঘটনাস্থলে এসেছি। হতাহতদের নামপরিচয় জানা যায়নি। নামপরিচয় শনাক্তের পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তার পাশাপাশি সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বগুড়া সদরে দম্পতি নিহত

এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়া বিমানবন্দর এলাকায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দম্পতি নিহত হন। তারা হলেন, বগুড়া সদর উপজেলার আতাপাড়া এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাবুল হাসান (৫০) ও তার স্ত্রী জেসমিন বেগম (৪৫)। এ ঘটনায় তাদের সঙ্গে থাকা সাত বছর বয়সি নাতি আহত হলেও সে শঙ্কামুক্ত রয়েছে। বগুড়া সদর থানার এসআই মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বাবুল হাসান স্ত্রী ও সাত বছর বয়সি নাতি জুলকার নাইনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে নওগাঁর দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় নওগাঁ থেকে আসা একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই বাবুল হাসানের মৃত্যু হয়।

পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত জেসমিন বেগম ও শিশুটিকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জেসমিনকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মিরাজুল মণ্ডল জানান, প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। মোটরসাইকেল চালক সংঘর্ষ এড়াতে সড়কের বাম পাশে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী জানান, প্রাইভেট কারটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক পালিয়ে গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এমই

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button