প্রায় এক বছর দেশে আ.লীগপন্থী ‘ভুয়া খবর’ ছড়িয়েছে এক ব্যক্তি: অ্যানথ্রপিক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভুয়া সংবাদ তৈরির একটি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে মার্কিন এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গাইবান্ধায় অবস্থানকারী এক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই কার্যক্রম চালিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ১৫৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এআইয়ের অপব্যবহারসংক্রান্ত এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘এআই-এর অপব্যবহার শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘GTG-54006’ নামে অভ্যন্তরীণভাবে শনাক্ত করা এই নেটওয়ার্কটি গাইবান্ধা জেলা থেকে পরিচালিত হতো। এতে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি ভুয়া সংবাদ এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির নির্দেশনা (ইমেজ প্রম্পট) তৈরি করা হয়।

নেটওয়ার্কটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ— বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি) বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়াত। একই সঙ্গে এসব খবরের একটি অংশ ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে অ্যানথ্রপিক বলেছে, এই অপপ্রচারের পেছনে কোনো দেশের সরকার বা প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করেছে— এমন কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। ১৫৪ পৃষ্ঠার পুরো প্রতিবেদনে ভারতের বিষয়ে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে শুধু এই একটি বাক্যে।
যেভাবে তৈরি ও ছড়ানো হতো ভুয়া খবর
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি ‘fake_news_3.py’ নামে একটি প্রোগ্রাম ব্যবহার করতেন। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যাচে একসঙ্গে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি ভুয়া সংবাদ এবং ১৫টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হতো।
ক্লড সরাসরি ছবি তৈরি করতে পারে না। তাই এসব প্রম্পট অন্য কোনো এআই ব্যবস্থায় ব্যবহার করে ছবি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকের মাধ্যমে ছড়ানো হতো। মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ ও কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া। ইউটিউবে ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড করা হতো। এক মাস আগেই এসব ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি নির্ধারণ করে রাখা যেত। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের একটি সেবা ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর অবস্থানও গোপন করা হতো।

অ্যানথ্রপিক জানায়, ব্যবহারকারীর নিজস্ব নোটেই এসব তথ্যকে ভুয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যেই কনটেন্টগুলো উসকানিমূলক ভাষায় তৈরি করা হতো।
ভুয়া সংবাদে কী ধরনের দাবি করা হতো
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের— এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটিকে (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি) ‘তালেবান ধাঁচের শাসন’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিত্রায়িত করা হতো।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন, তাদের ওপর হত্যাচেষ্টার মনগড়া গল্প, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং দলগুলোর মধ্যে গোপন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ভিডিও বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, এসব কনটেন্ট প্রকাশে জড়িত সব অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ওই কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট গণ্ডির বাইরে ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল— এমন কোনো প্রমাণও তারা পায়নি। প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রমটিকে তাদের ‘ব্রেকআউট স্কেল’-এর তৃতীয় শ্রেণিতে রেখেছে।
অ্যানথ্রপিক বলেছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট ক্লড অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্কটির আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শনাক্তকরণ পদ্ধতি তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ও অংশীদারদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্যও শেয়ার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের এই ঘটনাকে এআই ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ তৈরির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে অ্যানথ্রপিক।
প্রতিবেদনটিতে প্রতিষ্ঠানটির এআই মডেলের অপব্যবহারের সাতটি ক্ষেত্র তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো— সাইবার কার্যক্রম, প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণা, নজরদারি, অস্ত্র উন্নয়ন, জীববৈজ্ঞানিক অপব্যবহার, প্রতারণা এবং এআই মডেল চুরি।
অন্য ঘটনাগুলোর মধ্যে ব্যবহারকারীদের প্রতারণার উদ্দেশ্যে তৈরি ভুয়া ডেটিং অ্যাপ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের নজরদারির জন্য তৈরি বিভিন্ন প্রযুক্তির কথাও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিকের মতে, এসব ঘটনা দেখাচ্ছে যে এআই কীভাবে বড় পরিসরে অর্থ ও জনবলনির্ভর কার্যক্রমের সঙ্গে একক ব্যক্তির সক্ষমতার ব্যবধান কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে আগে যে ধরনের প্রচারণা চালাতে বড় একটি দলের প্রয়োজন হতো, এখন তা একজন ব্যক্তিও পরিচালনা করতে পারছেন।
এই অপব্যবহারে ক্লডের Haiku, Sonnet ও Opus মডেল ব্যবহার করা হয়েছিল। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, মডেল চুরির একটি ঘটনা ছাড়া তাদের Fable বা Mythos সিস্টেমের সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের সেবা কীভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে, তা নথিবদ্ধ করা নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করে তারা। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এআই ব্যবস্থা আরও সক্ষম হয়ে উঠলে এর ঝুঁকিও বাড়বে— যদি না প্রযুক্তি নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলো এআইকে আরও নিরাপদ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
source: Asia Post