News

‘ডোরি’ বলে রেস্তোরাঁয় পরিবেশন, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল পাঙাস

পাঙাস ও ডোরি মাছ© সংগৃহীত ও সম্পাদিত

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিভিন্ন অভিজাত রেস্তোরাঁয় ‘ডোরি মাছ’ নামে পরিবেশন করা হচ্ছে দেশীয় পাঙাস মাছ। এমন তথ্য উঠে এসেছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং ফিশ জেনেটিকস ও কনজারভেশন বিশেষজ্ঞ ড. রাকেব-উল-ইসলামের গবেষণায়।

গবেষণায় রেস্তোরাঁ থেকে সংগ্রহ করা ‘ডোরি’ মাছের নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে Pangasius hypophthalmus প্রজাতির পাঙাস মাছের ডিএনএর মিল রয়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশে গত কয়েক বছরে ডোরি মাছ আমদানির সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয় গবেষক ও ভোক্তাদের মধ্যে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ড. রাকেব-উল-ইসলাম বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করতে গবেষণা শুরু করেন।

গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের অন্তত তিনটি করে অভিজাত রেস্তোরাঁ থেকে ‘ডোরি মাছ’ হিসেবে পরিবেশন করা মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে এসব নমুনা থেকে ডিএনএ এক্সট্রাকশন, পিসিআর (PCR) ও ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা হয়।

গবেষক ড. রাকেব-উল-ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় সংগৃহীত নমুনাগুলোর ডিএনএ Pangasius hypophthalmus প্রজাতির পাঙাস মাছের সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ রেস্তোরাঁয় ‘ডোরি মাছ’ নামে পরিবেশন করা মাছগুলো মূলত পাঙাস।

ড. রাকেব-উল-ইসলাম বলেন, “৬ মাস আগে দেশে ডোরি ফিশের আমদানি শূন্যের কোঠায়—এমন একটি সংবাদ দেখার পর আমরা এটা নিয়ে গবেষণা শুরু করি। ঢাকা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত রেস্তোরাঁ থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ এক্সট্রাকশন, পিসিআর এবং এরপর ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখতে পাই, রেস্তোরাঁগুলোতে ডোরি ফিশ বলে পরিবেশন করা মাছটি মূলত পাঙাস মাছ।”

তিনি আরও বলেন, “সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষে এই মাছ দেখে যাচাই করার কোনো প্রক্রিয়া নেই। যেহেতু মাথা, চামড়া বা বাহ্যিক অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে না, তাই মাছটি আসলে কী—তা বোঝা কঠিন। এ ধরনের অনৈতিক কাজ থেকে ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ করতে ভোক্তা অধিকার–বিষয়ক কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে।”

জানা যায়, ডোরি বা জন ডোরি একটি সামুদ্রিক মাছ। এর শরীর চ্যাপ্টা, মাথা তুলনামূলক বড় এবং শরীরের দুই পাশে গোল কালো দাগ থাকে। এই বিশেষ দাগের কারণে মাছটি সহজেই শনাক্ত করা যায়।

স্বাদ ও গঠনের কারণে বিশ্বজুড়ে ডোরি মাছের চাহিদা রয়েছে। এর মাংস সাদা ও নরম হলেও সহজে ভেঙে যায় না। সমুদ্রে তুলনামূলক কম পাওয়া যায় এবং পুরো মাছের তুলনায় খাওয়ার উপযোগী অংশ কম হওয়ায় ডোরি মাছের দামও বেশি।

বিদেশের বাজারে এক কেজি ডোরি মাছের মাংসের দাম ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিপরীতে, দেশে চাষের পাঙাস মাছ ওজনভেদে প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে পাওয়া যায় এবং এটি বাজারে সহজলভ্য।

গবেষকের মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে ভোক্তারা বেশি দামে একটি মাছ কিনে অন্য প্রজাতির মাছ খাওয়ার পাশাপাশি সঠিক তথ্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

শুধু ডোরি নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁয় ‘টেংরা মাছ’ নামেও নদীর পাঙাসের জুভেনাইল বা পোনা পরিবেশনের বিষয়টি ড. রাকেব-উল-ইসলামের গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষকের মতে, পাঙাসের পোনা অন্য মাছের নামে বাজারজাত বা পরিবেশন করা হলে তা শুধু ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণার বিষয় নয় এর প্রভাব পড়তে পারে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও।

এ ধরনের মাছের পরিচয় গোপন করে ভিন্ন নামে বাজারজাত বা পরিবেশন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button