News

মেট্রোরেলের অতি আগ্রহ ও মাত্রারিক্ত ব্যয় ঢাকাকে ‘ট্র্যাপে’ ফেলে দিয়েছে: আইপিডি

বিগত এক দশকে ঢাকার বাসব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, বাস রুট রেশনালাইজেশনকে ব্যর্থ করে রাখা হয়েছে। বিনিয়োগ করার পরও এক হাজার কোটি টাকার জন্য বিআরটি প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেই। অথচ আড়াই লক্ষ কোটি টাকা দিয়ে নতুন তিনটি মেট্রোরেল অনুমোদন দেয়া হয়েছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবে মেট্রোরেল ১ ও মেট্রোরেল ৫ (উত্তর) এ দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বেড়েছে, যা বিদেশি ঋণের চাপ আরও বাড়াবে।

শুক্রবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক অনলাইন অনুষ্ঠানে এমন মতামত উলে এসেছে। সেইসেঙ্গ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং উপযোগিতা ও লাভ ক্ষতির যথাযথ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই মেট্রোরেল ১ ও মেট্রোরেল ৫ (উত্তর) সহ মেট্রোরেলের যে কোন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের উপর অতি আগ্রহ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় আমাদেরকে মেট্রোরেলের ট্র‍্যাপ এ ফেলে দিয়েছে। যোগাযোগ ও পরিবহনের অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ২০০৫ সালে প্রণীত ঢাকার জন্য স্ট্র‍্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস যোগাযোগ, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব সুবিধাদির উপর প্রাধান্য দেবার কথা হলেও সেসব জায়গায় বিনিয়োগ করার আগ্রহ দেখায়নি বিগত সরকারগুলো।

তিনি বলেন, এসটিপিতে ৬০ কিমির তিনটি মেট্রোরেলের প্রস্তাবনা থাকলেও পরবর্তীতে সংশোধিত এসটিপিতে ৬ টি মেট্রোরেল এর ১৪০ কিমির বেশি প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। সরকার মেট্রোরেলের মেগা প্রকল্প নিয়ে অতি আগ্রহ আছে, অথচ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে ব্যয় সাশ্রয় করতে উদাসীনতা দেখাচ্ছে। এত বড় প্রকল্প নিয়ে রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও গণ-মানুষের সাথে মতবিনিময় ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। অথচ ঋণের টাকা ও ভর্তুকি দিতে হবে জনগণকেই।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, ঢাকার মেট্রোরেল এর অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিকল্প বিআরটি, এলআরটি বা লাইট রেল ট্রানজিট, মনোরেল, কমিউটার রেল, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও উন্নত বাস সার্ভিস – এই ধরনের বিকল্পগুলো বিবেচনায় না নিয়েই ব্যয়বহুল মেট্রোরেল প্রকল্প একের পর এক পরিকল্পনা ও অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। ফলে লঙ্ঘিত হচ্ছে পরিবহন পরিকল্পনার ভারসাম্য।

আরও বলা হয়েছে, দেশের আড়াই লক্ষ টাকার মেট্রোরেল যখন অনুমোদন দেয়া হচ্ছে, তখন রেলের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ সংকট এর কারণে একের পর এক লোকাল ট্রেন ও মেইল ট্রেন বন্ধ হচ্ছে। ইঞ্জিন এর অভাবে মালবাহী ট্রেনগুলো পর্যন্ত ঠিকমতো চলাচল করতে পারছে না। দেশের রেলকেন্দ্রিক উন্নয়ন এর এই পরিকল্পনা বৈষম্যপূর্ণ এবং ভারসাম্যহীন।

পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, বর্তমানে মাত্র প্রায় ১ শতাংশ ট্রিপ মেট্রোর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, অথচ এর অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে সব মেট্রো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা হলেও তা সর্বোচ্চ ১০-১৫ শতাংশ ট্রিপ বহন করতে পারবে। ফলে বাকি ৮৫ শতাংশ বা তারও বেশি ট্রিপের জন্য কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, কোনো প্রকল্পে যে ব্যয় অনুমোদন করা হচ্ছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে যৌক্তিক ও ন্যায্য কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

আইপিডির রিসার্চ ফেলো ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর শিক্ষক কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে এত ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধি নিছক আর্থিক সমন্বয় নয়; এটি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় প্রাক্কলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক কনসালটেন্ট স্থপতি শোয়েব হাসান শ্রাবণ, আইপিডি রিসার্চ ফেলো ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা, আইপিডির সদস্য পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহমেদ মণ্ডল, পরিকল্পনাবিদ মো. সাজিদ ইকবাল, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব।

আইপিডির প্রস্তাবনা

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পক্ষ থেকে মেট্রোরেল প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বজায় রাখার জন্য কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— ঋণদাতাদের সাথে চুক্তির সময় কঠোর শর্ত পুনর্মূল্যায়ন করা, নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বদলে বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত দরপত্র নিশ্চিত করা; দেশীয় ঠিকাদার ও কারিগরি খাতের প্রকৌশলী ও স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা; ডিপিপি তৈরিতে স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল দিয়ে খরচ যাচাই-বাছাই করা; প্রকল্প পাসের সময় কেবল প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় না দেখিয়ে ২০-৩০ বছরের পরিচালন খরচ, ঋণের কিস্তি, ভর্তুকি এবং টিকিটের সম্ভাব্য মূল্যের হিসাব প্রকাশ করা; মেট্রোরেলের প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র, চুক্তির বিবরণ, ব্যয়ের হিসাব, সময়সীমা এবং সংশোধিত বাজেটের কারণ ডিএমটিসিএল ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা; আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে ৩–৪ গুণ বেশি খরচের ভূগর্ভস্থ লাইনের বদলে সাশ্রয়ী বিকল্প অবকাঠামোতে অগ্রাধিকার দেওয়া; প্রকল্পের বারবার মেয়াদ ও বাজেট বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

পরিবহন নেটওয়ার্কের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবনা

ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের অধীনে ঢাকার ৩ হাজারের বেশি বিচ্ছিন্ন বাসকে ৫–৬টি প্রাতিষ্ঠানিক কোম্পানির অধীনে আনা; তেজগাঁও, বনানী, মহাখালী ও টঙ্গী করিডোরে বিদ্যমান রেলওয়ের ডাবল-ট্র্যাককে চার ট্র্যাকে উন্নীত করে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রিক কমিউটার ট্রেনের আওতায় আনা; প্রতিটি মেট্রোরেল ও প্রধান বাস টার্মিনালকে পথচারী-বান্ধব ফুটপাত, সাইকেল লেন ও নিরাপদ অ্যাক্সেসের মাধ্যমে যুক্ত করা; স্টেশন কেন্দ্রিক ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে উচ্চ-ঘনত্বের মিশ্র ভূমি ব্যবহার ও সাশ্রয়ী সরকারি/সহজলভ্য ভাড়াবাসান পরিকল্পনা করা; কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর চাপ কমাতে পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার-ধামরাই এলাকায় স্বয়ংসম্পূর্ণ উপ-কেন্দ্র গড়ে তোলা; সড়ক, ট্রেন ও মেট্রোরেল সংক্রান্ত পৃথক সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতা দূর করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে একক ট্রাফিক ও পরিবহন নীতি-নির্ধারক হিসেবে আইনি অগ্রাধিকার দেওয়া; প্রতিটি নতুন পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কেবল মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নির্বাচন না করে বিআরটি বা লাইট রেলের মতো সাশ্রয়ী বিকল্পগুলোর জন্য স্বাধীন লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button