News

‘সাংবাদিকরাই তো সব শেষ করে দিল আমার’-কয়েক ঘণ্টা পরই স্ত্রীর মৃত্যু, রিমান্ডে নজরুল

‘ওহ সাংবাদিক, সাংবাদিক! সাংবাদিকরাই তো সব শেষ করে দিল আমার।’ রবিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকার সিএমএম আদালত থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক পরা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে কয়েকজন সাংবাদিক চিনতে পেরে দৌড়ে গিয়ে তার কিছু বলার আছে কি-না জানতে চাইলে একথা বলেন তিনি।

এর আগে পল্লবী থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্ট থেকে পাওয়া জামিননামা বিচারিক আদালতে দাখিল করেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই রাজধানীর ন্যাম ভবনের বাসা থেকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সেই মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

রবিবার পল্লবী থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আদেশের পর প্রয়োজনীয় জামিননামা দাখিল করতে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে সশরীরে হাজির হন গাজী নজরুল। জামিননামা দাখিল শেষে মাস্ক পরে আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর ওই কথোপকথন হয়।

এর কয়েক ঘণ্টা পরই আসে নতুন খবর। শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি মেয়েকে একটি কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
মরিয়মের বিছানার ওপর একটি হাতে লেখা চিঠি পাওয়ার কথাও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাম্পত্য সম্পর্ক, বিশ্বাসভঙ্গ ও মানসিক কষ্টের কথা লেখা ছিল বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তাধীন।

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। এতে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা মো. ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। পরে গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গত জুনে গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে ন্যাম ভবনের বাসায় থাকতেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো এবং তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছে এসব বিষয় জানিয়েছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুদ্দোহা সরকার রিমান্ড আবেদনে বলেন, মরিয়মের আত্মহত্যার পেছনে আসামিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্ররোচনা ছিল কি না, তাঁকে মানসিক চাপ, ভয়ভীতি বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

রিমান্ডের বিরোধিতা করে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, গাজী নজরুল মুক্তিযোদ্ধা ও চারবারের সংসদ সদস্য। তিনি ও তাঁর স্ত্রী বয়স্ক। তাঁরা পালিয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তি নন। মরিয়মের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত তাঁরাও চান এবং তদন্তে সহযোগিতা করবেন।

শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী গাজী নজরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলে বক্তব্য দিতে গেলে বিচারক তাঁকে মামলার বাইরের কথা বলতে নিষেধ করেন। পরে মামলার বিষয়েই বক্তব্য দিতে বলেন।

শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে পল্লবী থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। ওই মামলায় গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। সেই মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর রবিবার বিচারিক আদালতে জামিননামা দাখিল করেছিলেন তিনি।

কিন্তু জামিননামা দাখিল করে সিএমএম আদালত থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলা‘ সাংবাদিকরাই তো সব শেষ করে দিল আমার’—এই কথার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সামনে আসে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর খবর। আর আজ সেই মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাঁকে প্রথম স্ত্রীসহ আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এক দিনের ব্যবধানে বদলে যায় গাজী নজরুলকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ।

source: Barta Bazar

Leave a Reply

Back to top button