News

মব করে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য

কার্যলয়ে© সংগৃহীত

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হককে ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার (অর্থ) ও উপাচার্যের একান্ত সচিব মো. নাজমুল হোসাইনকেও মারধর করে পদত্যাগপত্রে সই করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

উপাচার্যের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা স্থানীয় ঠিকাদার ও বহিরাগতরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে বিএনপির স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, কেউ বিএনপির সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকেই ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নেয়। তারা ‘ভিসি ঘেরাও কর্মসূচি’ নামে মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় তারা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীরা উপাচার্যকে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দেন। পরে তারা উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশ করে তাকে ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন উপাচার্য।

চ্যান্সেলরের কার্যালয়ের জনবিভাগ সচিব এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ সচিব বরাবর দেওয়া উপাচার্যের পদত্যাগপত্রে লেখা হয়েছে, ‘বর্তমানে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে আমার পক্ষে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিধায় আমি আজ ৬ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করলাম।’

একই বক্তব্য লেখা আছে সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইনের পদত্যাগপত্রেও। এতে লেখা হয়েছে, ‘আমি ২০১৮ সাল থেকে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালায়ে সেকশন অফিসার (অর্থ) পদে চাকুরি করে আসছি। বর্তমানে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে আমার পক্ষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিধায় আজ ৬ অক্টোবর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা প্রদান করলাম।’

তবে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক দাবি করেন, এসব পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় তার কাছে ঠিকাদারি কাজ চাওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের কাজ না দিয়ে ঢাকার একজন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ তুলে একদল ব্যক্তি মঙ্গলবার জোর করে তার কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। আমাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি লাঞ্ছিত করা হয়। আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাদের তৈরি করা একটি পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

উপাচার্য বলেন, ‘একপর্যায়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আমি বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন। জোর করে এভাবে কখনো পদত্যাগ করানো যায় না। এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।’

তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা কার্যালয়ের সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক ও কম্পিউটারের সিপিইউ নিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সেখানে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই।

উপাচার্যের একান্ত সচিব ও সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইনও মারধরের অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ, রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শামীম, রাজপাড়া থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন, সহসভাপতি সালাম, লক্ষ্মীপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শাহিনসহ কয়েকজন তাকে মারধর করেন। পরে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিতে চান—এমন বক্তব্যসংবলিত একটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন নাজমুল হোসাইন।

তিনি বলেন, ‘তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। অস্ত্র ঠেকিয়ে তারা আমাকে স্বাক্ষর করায়। এটা কোনো ইস্তফা নয়, অস্ত্রের মুখে এটা করা হয়েছে।’

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণের ৫৩৯ কোটি টাকার দরপত্র সাবেক স্বাস্থ্য সচিব এবং বর্তমানে জনপ্রশাসন সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর নির্দেশে গত আট মাস ধরে আটকে রয়েছে।

প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়া এবং কারিগরি শর্ত পূরণ না করায় চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি বাদ পড়ে। ফলে ‘ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ একমাত্র যোগ্য দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। তবে এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশনায় দরপত্র মূল্যায়নের কার্যক্রম আটকে আছে বলে ওই গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিলেন উপাচার্য। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু হয়।

পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু স্থানীয় ঠিকাদার ও বহিরাগত হঠাৎ তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। স্থানীয়দের কাজ না দিয়ে ঢাকার ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে তারা তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।

তার অভিযোগ, একপর্যায়ে তারা জোর করে পদত্যাগপত্রে তার স্বাক্ষর নেন। পরে তাকে অফিস থেকে বের করে দিয়ে কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি। কারা করেছে, তা জানা নাই।’

মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বিষয়টি কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম। কারা করেছে, কেন করেছে তা আমার জানা নেই। জড়িতদের কেউ বিএনপির হলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button