Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
Bd বাংলাদেশ

আমেরিকায় ভারতের ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকিতে

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল নেয়, এমন দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যুক্তরাষ্ট্রের বিল ভারতের জন্য নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিলটির নাম ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’।

ধারণা করা হচ্ছে, এই বিল পাস হলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর আমেরিকা চাপ তৈরি করার সুযোগ পাবে, যাতে তারা রাশিয়া থেকে সস্তা তেল কেনা বন্ধ করে। বিলটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যদিও ভোটাভুটি এখনও হয়নি।

ট্রাম্প বলছেন, তাকে শুধু একটি জিনিসই থামাতে পারে, যেটি তার ‘নিজস্ব নীতি’, ও ‘নিজস্ব মন’। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের পর ভারতে প্রশ্ন উঠছে, তার কি আদৌ কোনো সীমা আছে? বিলটি পাস হয়ে গেলে ভারতের উপর কী প্রভাব হবে?

ভারতের ওপর প্রভাব

গত বছরের অগাস্ট মাসে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশি শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছিলেন, তখন দিল্লির দিক থেকে পাল্টা জবাব দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতকে যে নিশানা করছে, অথচ তারা নিজেরাই তো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছিল দিল্লি।

এটি স্পষ্ট যে, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া থেকে বড় পরিমাণে তেল আমদানি করে আসছে। তবে আমেরিকার শুল্ক আরোপের পর বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে। তবে ভারতকে হয় সেটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, অথবা ৫০০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে।

ভারতের গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এমন হলে আমেরিকায় ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আমেরিকায় ভারত ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অজয় শ্রীবাস্তব বলছেন, এখন পর্যন্ত ট্রাম্প নিজের ক্ষমতায় ভারতের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করেছেন। কিন্তু এই বিলটি কংগ্রেসে পাস হতে হবে। আমার মনে হয় না এই বিল পাস হবে। তবে ভারতের উচিত নিজের নীতি পরিষ্কার করা।

‘ভারত যদি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে চায়, তাহলে তা খোলাখুলি বলা উচিত। আর যদি না কিনতে চায়, সেটাও বলা উচিত। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর পাশাপাশি মার্কিন শুল্কের ক্ষতি সহ্য করা অসম্ভব,’ বলেন অজয় শ্রীবাস্তব।

ভারতের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বলেছিল, তারা জানুয়ারি মাসে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রত্যাশা করছে না। এটি এই মাসে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানিকে বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে, বলছে রয়টার্স।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, গত জুন মাস থেকে প্রতিদিন দুই দশমিক এক মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ‘২০২৪ সালে ভারত আমেরিকায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ’, বলছে ব্লুমবার্গ।

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সমুদ্রবাহিত রাশিয়ার তেলের বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে দাঁড়ায় ভারত। কম দামে তেল কিনে ভারত যেভাবে লাভবান হচ্ছিল, সেখানে রাশিয়ার তেলের আমদানি কমতে থাকা ভারতের জন্য এবং বিশ্ববাজারেও বাড়তি চাপের কারণ হতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি কোথাও গিয়ে থামবেন?

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়, তার বৈশ্বিক ক্ষমতার কি কোনো সীমা আছে? এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, একটি জিনিস আছে, আমার নিজের নৈতিকতা। আমার নিজের মন। সেটাই একমাত্র জিনিস, যা আমাকে থামাতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই। আমি মানুষকে ক্ষতি করার চেষ্টা করছি না।’

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের কি আন্তর্জাতিক আইন মানা উচিত? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি মানি। কিন্তু সিদ্ধান্ত আমি নেব। এটা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক আইনের আপনার সংজ্ঞা কী, তার ওপর।’

চীন-ভারত রাজনীতি

ভারতের ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য ইকোনমিক টাইমস তাদের একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, এই বিলটি মূলত ভারতকেই নিশানা করছে, যেখানে চীন অনেকাংশে নিরাপদ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সেখানে লেখা হয়েছে, রাশিয়ান তেল নিয়ে এখন পর্যন্ত কেবল ভারতের ওপরই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, আর চীনের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অজয় শ্রীবাস্তব পত্রিকাটিকে বলেন, এই বিলটি যদি সিনেটে পাসও হয়ে যায়, যার সম্ভাবনা কম, বাস্তবে এর লক্ষ্য হবে শুধু ভারত। চীন এর আওতার বাইরে থেকেই যাবে।

চীন ও ভারত, রাশিয়ান তেলের বৃহত্তম ক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম
অন্যদিকে সরকারি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য সরকারি টেন্ডারে দরপত্র দেওয়ার ওপর থাকা পাঁচ বছরের পুরোনো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এই নিয়ম অনুযায়ী, চীনা কোম্পানিগুলোকে দরপত্র দেওয়ার আগে ভারতের একটি সরকারি কমিটিতে নিবন্ধন করতে হতো এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অনুমোদন নিতে হতো।

চাপের কৌশল ও ভূ-রাজনীতি

আমেরিকায় ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানোর বিল আনার পাশাপাশি দেশটি নিজেকে ভারত-নেতৃত্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স বা আইএসএসহ প্রায় এক ডজন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

ভারত ও ফ্রান্স যৌথভাবে এই সংস্থাটি গঠন করেছিল। এর সদস্য দেশ ৯০টিরও বেশি এবং সদর দপ্তর নয়াদিল্লিতে। আইএসএ থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ভারত সরকার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

এছাড়া এই ঘোষণা এমন সময় এসেছে, যখন এই সপ্তাহে ভারতের জন্য মনোনীত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর দিল্লিতে পৌঁছানোর কথা। তিনি ১২ জানুয়ারি থেকে ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূতের দায়িত্ব নেবেন।

‘রাশিয়ান নিষেধাজ্ঞা বিল’ মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম উত্থাপন করেছেন (বামে), তার পাশে ডোনাল্ড ট্রাম্প
ভারতের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অনন্ত সেন্টারের সিইও, ইন্দ্রাণী বাগচী, এই বিল এবং আমেরিকার কৌশল সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একটি দীর্ঘ পোস্ট লিখেছেন।

তিনি উল্লেখ করছেন, ট্রাম্পের এই বিল সামনে নিয়ে আসার পেছনে ইউক্রেন ঘিরে আমেরিকার হিসেব নিকেশ কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ রাশিয়ার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এমন অবস্থায় ‘আমেরিকা যদি ভারত, চীন এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেন সম্পর্কিত এমন একটি চুক্তিতে সম্মত হতে পারে, যেখানে কিয়েভকে মস্কোর পক্ষে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে,’ লিখেছেন ইন্দ্রাণী বাগচী।

তার মতে, শুল্কের বিল পাস হলেও এতে প্রেসিডেন্টের ছাড় দেয়ার সুযোগ থাকায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বিশেষ ছাড় পেতে পারে। ফলে ‘ইউরোপ বাধা ছাড়াই রুশ জ্বালানি কিনতে থাকবে। আমেরিকা এখনও রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ইউরেনিয়াম কেনে। এটাও স্পষ্ট নয় যে, আমেরিকা বর্তমান আইন অনুযায়ী ২০২৮ সাল পর্যন্ত নিজেকে ছাড় দিয়ে যাবে কি না।’

বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকায় এই ৫০০ শতাংশ শুল্ক বা তেল কেনাবেচা বন্ধ হলেও এতে ভারত বা রাশিয়া খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে মনে করেন তিনি। গত এক বছরে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই সম্পর্ক আগামী কিছু সময়ের জন্য ‘আইসিইউ’তে থাকবে বলে মনে করছেন তিনি।

রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারত শীর্ষ দেশগুলির মধ্যে একটি
অপর দিকে গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ -এর একটি প্রতিবেদন বলছে, ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানিও বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকা থেকে ভারতের বার্ষিক আমদানি বর্তমানে ১২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

প্রাক্তন বাণিজ্য সচিব অজয় দুয়া আরটি ইন্ডিয়াকে বলেন, ৫০০ শতাংশ শুল্ক বাধা দেওয়ার একটি উপায় ছাড়া আর কিছুই নয়, এটি বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো।

তিনি উল্লেখ করেন, আমরা বর্তমানে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিচ্ছি, যদি আমরা ৫০০ শতাংশ শুল্ক দেই, তাহলে আমেরিকার কেউ ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য কিনতে পারবে না। আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে হবে।

 

বার্তা বাজার/এস এইচ

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু

Source: bartabazar.com

Back to top button