ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষেধাজ্ঞা: বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান জামায়াত-এনসিপির, বিএনপির নীরবতা

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের ভেতরে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ ইনচার্জ এবং আনসার-ভিডিপির সদস্যরা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রয়েছেন। সাধারণ ভোটার, পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ অন্যদের ক্ষেত্রে এ বিধি আরোপ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
কেউ কেউ অভিযোগ করে বলছেন, নির্বাচনে বাধাহীনভাবে অনৈতিক প্রভাব খাটানো কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং বা ব্যালট জালিয়াতি করা জন্য নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সুবিধার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে, ইসির এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখার দায়ে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দায়ী করছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাকর্মীরা বিভিন্নকিছু লেখালেখি করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষের চলাচলের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস হল মোবাইল ফোন। যা সবসময়ই সবার সঙ্গে থাকে। আর যারা দূর-দূরান্ত থেকে কোনো কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার জন্য যাবেন তারা বাসায় বা কেন্দ্রের বাইরে কোথায় মোবাইল রেখে কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে, গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকাংশেরই পেশাগত দায়িত্বের সার্বিক কার্যাবলি মোবাইল ফোনভিত্তিক পরিচালিত হয়। সেক্ষেত্রে মোবাইল ফোন তাদের জন্য অত্যাবশ্যক একটি সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাছাড়াও, পর্যবেক্ষক যারা থাকবেন তাদের বিভিন্ন কাজেও মোবাইলফোন দরকার হয়। এর বাইরে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তা
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অভিযোগ জানিয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক সাইদুর রহমান। বিভিন্ন সময়ে বিএনপির পক্ষে সক্রিয় থাকা এ সাংবাদিক ফেসবুকে লেখেন, ‘ভোট ডাকাতির নতুন কৌশল। মেটিকুলাস ডিজাইনে ভোটের পথে সরকার? মোবাইল নিয়ে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে তিন ক্যাটাগরির ব্যক্তি ছাড়া কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। পোলিং এজেন্ট বা সাংবাদিকও মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রে যেকে পারবেন না। যদি মোবাইল নিয়ে যেতে নাই পারে তাহলে পোলিং এজেন্ট এবং সাংবাদিকমুক্ত ভোটের ব্যবস্থা করলেই হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে ভোট ডাকাতি সম্পন্ন করতে যা যা করার প্রয়োজন তার একটি ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হয়। এটি ভয়ংকর একটি পরিকল্পনা। ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম হলে সেটি কিভাবে প্রচার করবেন সাংবাদিকরা? আজকাল সরাসরি সম্প্রচার, এমনকি চিত্রধারনেও মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হয়। যারা তা করেন, তাদের জন্য ইসির নির্দেশনা কী? অথচ এই নির্দেশনা যদি দেয়া হয় কেন্দ্রে তাহলে অনুমতিপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের কার্ড দেয়ার দরকার কী? কারা ইসিকে এসব অদ্ভূত বুদ্ধি দেয়? ওদের মাথায় কি কিছুই নাই। এই কালো আইন বা সিদ্ধান্তের ধিক্কার জানাই। অবিলম্বে এটি প্রত্যাহার করে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, এই দেশের মানুষ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। রক্তের বিনিময়ে এই অধিকার অর্জিত হয়েছে। মানুষ নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দিতে চায়, প্রার্থী ও প্রতীক নিয়ে উদযাপন করতে চায়। নির্বাচনের দিন গণতন্ত্রের উৎসব উদ্যাপনের দিনে পরিণত হওয়া উচিত। সেদিন গর্বভরে ভোটার লাইনে দাঁড়াবে, ছবি তুলবে, আর নিজের পছন্দের স্বাধীনতাকে উপভোগ করবে। এর ব্যত্যয় ঘটার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি এই অধিকার কেড়ে নিতে চায় বা এতে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে, তবে তার মনে রাখা উচিত-এই জাতি প্রস্তুত। প্রয়োজনে এই অধিকার আবারও লড়াই করেই রক্ষা করা হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, ‘ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের অর্থ হলো সবাইকে নিজের মোবাইল ঘরে রেখে যেতে হবে। এমনকি কোনো মোজো সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিজমও এলাউড না। এটা স্পষ্টত হঠকারী সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং বা জালিয়াতি করার ইচ্ছে থাকলেই কেবল এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল নিয়ে না যাওয়ার কোনো লজিক নেই। এমনটা আগে কখনো দেখিনি। এটার মানে কোনো বিপদ হইলেও কল করে কাউকে জানানো যাবে না। অনেকে নিরাপত্তাহীনতার জন্য মোবাইল নিতে না পারলে ভোট দিতেও যাবে না।’
হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, ‘সিসি ক্যামেরা থাকলেও তাৎক্ষণিক কোনো কাজে দিবে না। মোবাইলের মাধ্যমে সাংবাদিকরা যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে, অনিয়ম জালিয়াতির চিত্র দেখাতে পারবে তা ক্যামেরা পারবে না। কেন্দ্র দখল-ভোট চুরি ঠেকাতে ব্যক্তিগত ফোন কার্যকর হবে।সাথে সাথেই ভিডিও রেকর্ড হয়ে যাবে। হয়ত এসব জালিয়াতির ভিডিও কেউ করতে না পারে সে জন্য ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন। এটা সুস্পষ্টভাবে ভোট চু/রির সুযোগ করে দেয়া। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত।’
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম ফেসবুকে লেখেন, ‘ভোটকেন্দ্রে বিএনসিসি প্রত্যাহারের পর এবার মোবাইল নিষিদ্ধের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হলো। কার ইশারায়, কার প্রভাবে নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিলো? ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের অর্থ হলো সবাইকে নিজের মোবাইল ঘরে রেখে যেতে হবে। এমনকি কোনো মোজো সাংবাদিক বা সিটিজেন জার্নালিজমও এলাউড না। অর্থাৎ, ভোটকেন্দ্র এলাকায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার কোনো তথ্য, ফুটেজ স্বয়ং ভুক্তভোগীর কাছেও থাকবেনা। নির্বাচন কমিশনের উপর ভর করে এই নব্য ফ্যাসিজম জাতির উপর কারা চাপিয়ে দিলো?’
তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘কারা দেশের তরুণদের ভয় পায়? কারা নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে চায়? দেশের সর্বস্তরের তরুণ যুবকদের প্রতি আহবান- আসুন, আওয়াজ তুলুন। আপনাদের হাতেই জুলাই হয়েছে, আপনাদের হাতেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের দায়িত্ব।’
সবশেষে সাদিক কায়েম বলেন, ‘দেশের নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য কিংবা কোনো গোষ্ঠীর পারপাস সার্ভ করার জন্য ইলেকশন কমিশন গঠিত হয়নাই, ইলেকশন কমিশন গঠিত হয়েছে একটি ফ্রি, ফেয়ার এবং নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, অনতিবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীম উদ্দিন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও গত ডাকসু নির্বাচনের জিএস প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম ফেসবুকে লেখেন, ‘ভোটকেন্দ্র সীমানার ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ সিদ্ধান্তটি সেই মিউজিয়ামে থাকা হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে মোবাইলের অনুমতি দিলে যারা নকল সিল বানিয়েছে ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে সেই দলটির এ ধরণের কাজ সম্পাদন সহজে হবেনা, যারা বিভিন্ন অনিয়ম করতে চায় ওঁৎ পেতে আছে তাদের কাজ কঠিন হবে বলেই কি এ ধরণের নিয়ম জারি? এ নির্বাচন নিয়ে বিন্দুমাত্র টালবাহানা, কোন প্রকার প্রতারণা বা কালিমা লেপন আমরা ঐক্যবদ্ধ বংলাদেশীরা কিন্তু মেনে নিবনা।’
প্রসঙ্গত, গতকাল রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) ইসির সিনিয়র সহকারি সচিব মো. শহিদুল ইসলাম মোবাইল নিয়ে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা পাঠান। এতে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণভাবে কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না।
তবে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ইনচার্জ এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারকারী অঙ্গীভূত আনসার, সাধারণ আনসার ও ভিডিপির দুজন সদস্য এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন বলেও নির্দেশনায় জানানো হয়।
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: thedhakadiary.com

