News
এক দফা ইস্যুতে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হট্টগোল, কী আছে সেই ‘বিতর্কিত’ ডকুমেন্টারিতে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একটি ডকুমেন্টারি (প্রামাণ্যচিত্র) প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে।
অনুষ্ঠানে ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। ওই ভিডিওতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন বিভিন্ন স্থানের প্রতিরোধের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্রকে এতে দেখা যায়নি। এই ভিডিওর একটি অংশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট একটি বক্তব্য রয়েছে।
ভিডিওর ভয়েসওভারে বলা হয়েছে, ‘৫ আগস্ট ২০২৪। ফিনিক্স পাখির মত ছাইয়ের ভেতর থেকে জেগে ওঠা এক বাংলাদেশ। পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসে মুক্তির নিঃশ্বাস। ১৭ বছরের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নিজ দেশে পরাধীনতার জীবন, জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ থেকে জ্বলে ওঠে প্রতিরোধ। বদলে দেওয়ার এক বীরোচিত লড়াই। যে লড়াই ধীরে ধীরে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। রূপ নেয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে ছাত্র-জনতাকে সাথে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে আসে বিএনপির নেতা ও কর্মীরা। হাজারের ওপর শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয় ৫ আগস্ট।’
তথ্যচিত্র প্রদর্শন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিলনায়তনের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবাদের আওয়াজ ওঠে। একপর্যায়ে উপস্থিত অনেকে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে আপত্তি জানান। এতে পুরো মিলনায়তনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকগণ অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
এ সময় উপস্থিতদের একাংশ অভিযোগ করেন, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও শহীদদের আত্মত্যাগ যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা। পরে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত জুলাই যোদ্ধা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের একাংশ দাঁড়িয়ে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে পুরো মিলনায়তনে হট্টগোল ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে মঞ্চে এসে উপস্থিতদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। তবে তার বক্তব্যের পরও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতৃত্ব ও এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।
মঞ্চে উঠে আখতার হোসেন বলেন, প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে অনেক অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। বিষয়টি সরকারের নজরে আনা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান আখতার হোসেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়ে যান। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আবারও মঞ্চে আসেন। তিনি প্রামাণ্যচিত্রে থাকা অসম্পূর্ণতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে উপস্থিত শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চান।
মন্ত্রী জানান, প্রতিবাদকারী শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্য থেকে একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটি পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও শহীদদের আত্মত্যাগ যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।
এ ঘোষণার পর প্রতিবাদকারীরা শান্ত হন এবং অনুষ্ঠানস্থলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরে সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার অন্যান্য কর্মসূচি যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সকালে তিনি একটি সুন্দর অনুষ্ঠান দেখেছেন এবং সেখানে মানুষের ঐক্য দেখেছেন। তবে প্রামাণ্যচিত্রে কিছু ভুল ছিল।
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদের ছবিই দেখলাম না। ভুল হতেই পারে। কিন্তু এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ক্ষমা চাওয়ার পরও যে ঘটনা ঘটল, তা অনভিপ্রেত। জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন ঘটনা মোটেই কাম্য ছিল না।’
বিদেশি অতিথিদের অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিদেশি অতিথিরা অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন, এটি তো ভালো দেখাল না। আমরা জাতীয় ঐক্য দেখাতে পারলাম না। সংসদ ভবনের মতো এখানে ওয়াকআউট করা একেবারেই শোভনীয় ছিল না।’
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সামনে “ভুয়া ভুয়া” স্লোগান দেয়া কোনোভাবেই মানানসই নয়। আমরা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এখানে এসেছি, উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। ভুল করলে শুধরে দেবেন, কিন্তু বিশৃঙ্খলা করে কোনো লাভ নেই।’
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার। এই সরকার আওয়ামী লীগ হতে পারবে না, হতেও চায় না। আওয়ামী লীগের কোনো অনুশোচনা নেই। তারা দেশে আসার ঘোষণা দেয়; আসেন, দেখা হবে রাজপথে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
জুলাই আন্দোলনকারীদের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেবে। শহিদদের মর্যাদা রক্ষা এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসার সব ব্যবস্থা সরকার নিশ্চিত করবে।
source: The Dhaka Diary