প্রাইমারিতে ভেরিফিকেশনে ছাত্রদল এবং বিএনপি পরিবার ছাড়া সবাইকে গণহারে বাদ দেওয়ার অভিযোগ!

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজার প্রার্থীর নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে দেখা দিয়েছে চরম বিতর্ক ও অসন্তোষ। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও সারা দেশে অসংখ্য প্রার্থী শেষ মুহূর্তে পুলিশের ‘নেগেটিভ’ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের অজুহাতে নিয়োগপত্র পাননি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও কেবল বিএনপি বা ছাত্রদলের দলীয় পরিচয়ের অভাব এবং অ-বিএনপি পরিবারের সন্তান হওয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গণহারে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যেন হাহাকার ও ক্ষোভের বন্যা বইছে। গণমাধ্যমকর্মী নূর হোসেন ফেসবুকে লেখেন, “প্রাইমারির ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া ভাই-বন্ধুদের পোস্ট দেখে চোখের পানি আটকাতে পারতেছি না। খোদার কসম, এসব দেখার জন্য জুলাই হয়নি।” আইনুল হক নামে এক প্রার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রাজনীতির সাথে যুক্ত না থেকে সম্পূর্ণ ক্লিন ইমেজ বজায় রাখার পরও ভেরিফিকেশনে তাঁর নাম বাদ পড়ে। আবার বিকাশ দাশ নামে অপর এক প্রার্থী প্রশ্ন তুলেছেন—তার গ্রামে একজন সাবেক আওয়ামী লীগ এমপির বাড়ি হওয়াই কি তার অপরাধ?
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের দীর্ঘ সাত মাস পর এভাবে গণহারে প্রার্থীদের বাদ দেওয়াকে ঘিরে চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। নিয়োগের আশায় অনেকেই আগের চাকরি ছেড়েছেন, পড়াশোনা স্থগিত করেছেন, এমনকি বিবাহের বন্ধনেও আবদ্ধ হয়েছেন। এখন নিয়োগপত্র না পেয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। ওমর ফারুক নামে এক নেটিজেন এই অনিশ্চয়তার কথা তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং অলক পাল নামে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন তাঁর ছোট ভাইয়ের এমন অন্যায্য বাদ পড়ার কথা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অন্তত ১৫টি জেলায় ৩৫১ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নিয়োগপত্র না পাওয়ার সত্যতা মিলেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বোচ্চ ১২০ জন, বগুড়ায় ৪৮, পাবনায় ৩৫, চাঁদপুরে ২৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, মানিকগঞ্জে ২২, কুষ্টিয়ায় ১৬, রাজবাড়ীতে ১৫, ঝালকাঠি ও ফরিদপুরে ১২ জন করে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, শরীয়তপুরে ৬, মুন্সিগঞ্জে ৩ এবং সাতক্ষীরা ও লক্ষ্মীপুরে ২ জন করে বাদ পড়েছেন। ঝিনাইদহের মহেশপুরের এক শীর্ষ মেধাবী প্রার্থী জানান, সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে কাগজ জমা দেওয়ার পরও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এমন গণহারে বাদ পড়ার বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলেনি। অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শাখার উপপরিচালক জয়নাল আবেদীন বিষয়টি জানেন না বলে জানান। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পলিসি অ্যান্ড অপারেশন শাখার এক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন—ভেরিফিকেশনে নেগেটিভ রিপোর্ট, কাগজপত্রের অসঙ্গতি বা শূন্যপদের অভাবের কারণে এমনটা হতে পারে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১টি জেলায় অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর শিক্ষক নিয়োগের মতো জায়গায় দলীয় বিবেচনা ও রহস্যজনক ভেরিফিকেশনের নামে বৈষম্যের ঘটনায় সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি চাকরিতে কেবল নিজস্ব দলের অনুসারীদের সুযোগ দেওয়ার এমন নীতি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য চরম ভাবমূর্তি সংকট তৈরি করবে।
source: Azadir Dak