অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দিন আজ

ছাত্র-জনতার ৩৬ জুলাইর বিপ্লবে ১৪০০ শহীদ আর প্রায় ২০ হাজার আহতের বিনিময়ে টানা সাড়ে ১৫ বছরের ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে আওয়ামী সরকার। সীমাহীন জনরোষ থেকে প্রাণ বাঁচাতে গোপনে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। তার দলের নেতারা চলে যান আত্মগোপনে। মন্ত্রী-এমপি, আমলা, পুলিশ থেকে শুরু করে জাতীয় মসজিদের খতিব— যে যেভাবে পেরেছেন নিজেকে রক্ষার তাগিদে পালিয়ে গেছেন।
নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কোনো সরকার নেই তিনদিন। প্রতি মুহূর্তে, প্রতিনিয়ত নানা ধরনের গুজব, গুঞ্জন দানা বাঁধছে। সর্বত্র নৈরাজ্যকর এক পরিস্থিতি, যা আগে কখনো দেখেনি দেশবাসী। সবাই উৎকণ্ঠিত, আতঙ্কিত—কখন কী হয়, কীভাবে ঘটবে একটা শান্তিপূর্ণ উত্তরণ। এমন এক পরিস্থিতিতে নোবেল শান্তিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় অলিম্পিক কমিটির আমন্ত্রণে ফ্রান্সে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হাসিনার পতনের পর দেশ পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অন্দর মহলে চলতে থাকে নানা আলোচনা, তৎপরতা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর ৬ আগস্ট রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন ড. ইউনূস। তিনি প্যারিসে চিকিৎসা শেষে ৮ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে দেশে ফেরেন এবং ওই দিন রাত ৮টার দিকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেন। তার সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে আরো ১৬ জন শপথ নেন। তিনজন ছাত্র উপদেষ্টাও যুক্ত হন নতুন সরকারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের কাজে হাত দেয় ইউনূস সরকার। সংস্কারের জন্য ১১টির মতো সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সংলাপ করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ করা হয়। এতে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নমতসহ স্বাক্ষর করে প্রায় সব দল। গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ অনেককে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। হাসিনার মামলার রায় হলেও অনেক মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি ঘটে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়। সবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিদায় নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
তারা বললেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই হাজারের উপরে আন্দোলন সংগঠিত হয়। এর মধ্যে সিংহভাগই ছিল নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে। শুরুতেই আনসার বিদ্রোহ, প্রশাসনিক বিদ্রোহ ও জুডিশিয়াল ক্যুর মতো অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয় সরকারকে। সরকার অনেক ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হলেও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরুতেই ব্যর্থ হয়। আমলাসহ নানা মহলের অসহযোগিতার কারণে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে। তারপরও অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে সংস্কার ও জুলাই সনদ প্রণয়ন এবং গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের রায় হয় ওই সরকারের সময়। ভারতের হস্তক্ষেপের বাইরে থেকে দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর রেখে যাওয়া এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, অনেক সংকটের মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে ড. ইউনূস সরকারকে। তারা স্বস্তিতে কাজ করতে পারেননি। রাজনৈতিক দলগুলো চাপ দিতে অসংখ্য আন্দোলন করেছে। চাপের মুখে আনরিজলভড অনেক ইস্যু রেখেই তড়িঘড়ি একটা নির্বাচন দিয়ে যেতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে।
২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপের কারণে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে ইউনূস সরকার। দেশের ইতিহাসে একটি সেরা নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার করেন তিনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো দু-একটি বিষয়ে প্রশ্ন তুললেও সার্বিকভাবে ফলাফল মেনে নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা নির্বাচন কাঙ্ক্ষিত মানের হয়েছে বলে জানায়। এ নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেন, এ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য নতুন বেঞ্চমার্ক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হওয়া ২৪ হাজারের বেশি রাজনৈতিক মামলা থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন দলের পাঁচ লাখ নেতাকর্মীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রমুখ। এছাড়া নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার।
একতরফাভাবে ভারতকে দেওয়া ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হয়। ‘ফেনী চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিত মিরসরাইয়ে ভারতকে দেওয়া ৯০০ একর জমি অবমুক্ত করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শতকরা ৯০ ভাগ সফল হওয়ার দাবি করেন তৎকালীন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, সরকারের সব পদক্ষেপই ছিল দেশ ও জনগণের কল্যাণে। ওই সময় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি হয়েছে; যার প্রায় ৮৪ শতাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে বলে বিদায়ী ভাষণে জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, সংস্কার অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু তার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করে দিয়েছে নতুন সরকার।
অনেকগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ভাগ্যে কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। অনেকগুলো নিজেদের মতো করে পাস করেছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। গণভোটের রায় না মানলে সরকার সমূহ বিপদে পড়বে বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয়, ভারতের প্রেসক্রিপশনে জুলাইকে নাই করে দেওয়ার একটা চেষ্টা চলছে।
মেগা প্রকল্পের নামে সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাট আর ব্যাপকভাবে অর্থ পাচারের ফলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বিকল হয়ে পড়েছিল। সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে শ্বেতপত্রে। সে হিসাবে ১৫ বছরে পাচার হয়েছে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আইএমএফের হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক সময় ১৫-১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এলেও বর্তমানে তা ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন শেখ হাসিনা, তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা হয়।
একই দিনে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর হাসিনাসহ তিন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করা হয়। এতে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। এছাড়া রাজসাক্ষী হয়ে ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ড. দিলারা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে গণহত্যার বিচারটা ইউনূস সরকার শুরু করেন। অনেক মামলার অগ্রগতি করে গেছে। শেখ হাসিনার মামলার রায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হয়েছে। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের রিপোর্ট দেওয়া হয়। ভারতকে ইউনূস সরকার কড়া বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকারের সময় বিচারকাজ মন্থর হয়েছে। বিডিআর হত্যার রিপোর্টটিও প্রকাশ করা হয়নি। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় অনেকদূর এগিয়েছিল ড. ইউনূসের সরকার, তাও এখন থমকে গেছে।
জনপ্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে কাটে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর। আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতা, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক বিরোধ, পদোন্নতি-পদায়নসহ স্বার্থ আদায়ে সরকারকে চেপে ধরাসহ উপদেষ্টা পরিষদের মতভেদের কারণে জনগণকে বহুল কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয় এ সরকার।
এ সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা উপদেষ্টাদের ঘেরাও এবং সচিবালয় অচল করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে একাধিকবার। এজন্য জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা দায়ী করেছে আমলাতন্ত্রের উচ্চাভিলাষী আর সরকারের নতজানু মনোভাবকে। প্রশাসন থেকে যথাযথ সহযোগিতা না পাওয়ার কথা একাধিক উপদেষ্টার মুখ থেকেও এসেছে। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সচিবের অভিযোগ ছিলÑপতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনের ওপর ভর করে অন্তর্বর্তী সরকারেরও প্রশাসন সাজাতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি হয়েছে। উপদেষ্টাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও এ ব্যর্থতার কারণ।
এমই
source: Daily Amar Desh