News
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষে বিএনপিতে পুনর্গঠন, কাল মন্ত্রিসভায় আসতে পারে দুই নতুন মুখের প্রজ্ঞাপন

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির দলীয় কাঠামো ও সরকারের মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ায় তার দলীয় ও সরকারি দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সময়ে মন্ত্রিসভায় সীমিত পরিসরে রদবদল এবং নতুন দুজনকে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
কাল ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তার শপথের পর দল ও সরকারে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হতে পারে বলে দলীয় ও সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও এই ধাপে মন্ত্রিসভায় নতুন দুজন যুক্ত হতে পারেন। তারা হলেন বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবং গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন।
সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী এবং শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট অথবা নতুন রাষ্ট্রপতির শপথের আগে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
সূত্রের দাবি, নতুন দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ২২ আগস্ট নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিতে পারেন। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তিন কার্যদিবসের মধ্যে শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভায় শপথ নেওয়া অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর প্রায় দুই মাস ধরে মন্ত্রণালয়টিতে নতুন মন্ত্রী নিয়োগের আলোচনা চলছে। বর্তমানে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।
অন্যদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৪ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এক লাখ ৪২ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। কয়েক দিন ধরে তাকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে। তবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাচিং প্রু জেরী বলেন, এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
বর্তমান মন্ত্রিসভার মোট সদস্যসংখ্যা ৫০। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। মন্ত্রিসভার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার। নতুন দুই সদস্য যুক্ত হলে মন্ত্রিসভার আকার আরও বাড়বে।
মহাসচিব পদে রিজভীকে ঘিরে আলোচনা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব পদটি শূন্য হবে। এ পদে তাৎক্ষণিকভাবে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সদ্য জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া রুহুল কবির রিজভীর নাম। দলীয় একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, দলীয় কার্যালয় পরিচালনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন রিজভী। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই অন্তর্বর্তী সময়ে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ছন্দপতন হবে না বলে মনে করছেন দলের একাংশের নেতারা।
তবে স্থায়ীভাবে পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা আরও বিস্তৃত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের নামও আলোচনায় রয়েছে। দলীয় পুনর্গঠনের পর আগামী কাউন্সিলে মহাসচিব পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
রিজভীকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের কাজ করার জন্য নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করেছেন। এ জন্য তিনি দলের চেয়ারম্যানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দেশের ও দলের জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদেও পরিবর্তনের আলোচনা
মহাসচিব পদে পরিবর্তনের পাশাপাশি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদেও পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে থাকা হাবিব উন নবী খান সোহেল ও আব্দুস সালাম আজাদের নাম এ পদের জন্য আলোচনায় রয়েছে।
দপ্তর সম্পাদক পদেও নতুন মুখ আনার আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, রকিবুল ইসলাম বকুল, আজিজুল বারী হেলাল, কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, মুনির হোসেন, আবদুল লতিফ জনি ও এবিএম মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নিয়েই বেশি আলোচনা
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসবে। এ নিয়েই সরকারের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। সরকারের উচ্চপদস্থ দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ছয় মাসের কাজ পর্যালোচনা করে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে রাষ্ট্রপতির শপথের আগে বড় ধরনের মন্ত্রিসভা রদবদলের সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
দলীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদের নাম। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এই নেতাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আনা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বকুলের নামও রয়েছে আলোচনায়।
আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে রদবদলের সম্ভাবনা
সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় স্থানীয় সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নামও রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, জয়নুল আবদিন ফারুক ও শামসুজ্জামান দুদুসহ আরও কয়েকজন নেতাকে আনার আলোচনা রয়েছে। কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলের নামও সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
শরিকদেরও মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার আলোচনা
বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা মিত্র ও শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমের নাম আলোচনায় রয়েছে।
গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপি ও তাদের মিত্র-শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শরিকদের সহযোগিতা কামনা করা হয়। এর পর থেকেই মন্ত্রিসভায় শরিকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সংসদ উপনেতা নিয়েও আলোচনা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসনটিও শূন্য হবে। ফলে ওই আসনে উপনির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার পরিবারের সদস্যদের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে সংসদ উপনেতা কে হবেন, সেটিও পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে চূড়ান্ত হতে পারে। এ পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও সালাহউদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দল ও সরকারের পুনর্গঠন বা রদবদল একটি রুটিন কাজ। প্রয়োজনের তাগিদেই পুনর্গঠন বা রদবদল করা হয়। সরকারপ্রধান প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে তিনিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কার্যসম্পাদনের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এদিকে রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে বঙ্গভবনে প্রস্তুতি চলছে। তবে শপথের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরই শপথের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
source: The Dhaka Diary