News

ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া কে এই লিংকন, কওমি আলেমদের কেন তাকে নিয়ে আপত্তি?

মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন© সংগৃহীত
গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার পর তাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠন তার নিয়োগের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষক তার নিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
 
শামীম কায়সার লিংকন ২১ আগস্ট বঙ্গভবনের দরবার হলে ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৮০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন শামীম কায়সার লিংকন। তার বাবা আবদুল মোত্তালিব আকন্দ এবং মা আফরোজা আনার বিলকিস।
 
ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত লিংকন। ২০০৬ সালের উপনির্বাচনে প্রথমবার গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।
 
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন লিংকন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুর রহিম সরকারকে ২ হাজার ১১২ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে তিনি বিজয়ী হন। গাইবান্ধার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এবার একমাত্র বিএনপি প্রার্থী হিসেবে শামীম কায়সার লিংকন জয় পান।
 
শপথের আগে শুক্রবার বিকেলে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আবেগঘন পোস্ট দেন তিনি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, জানা-অজানা অসংখ্য মানুষের দু’আ, অশ্রু ও চেষ্টার ফলাফল।’
 
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন
 
শামীম কায়সার লিংকন ১৯৯৫ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ১৯৯৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
 
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে বিবিএ এবং ২০০৬ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেন। মালয়েশিয়ার আইআইএফ থেকে আইসিটিতে মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। এর আগে এনআইআইটি থেকে ২০০০ সালে নেটওয়ার্ক, ফাইন্যান্স অ্যান্ড এমআইএস বিষয়ে দুই বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
 
পেশায় ব্যবসায়ী লিংকন এমবিএ পড়ার সময় ২০০৬ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
 
কওমি আলেমদের আপত্তি
 
শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী না করার দাবি জানিয়েছে কওমি-সংশ্লিষ্ট সংগঠন ‘সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ’। একই সঙ্গে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে আলোচনা করে একজন যোগ্য, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
 
বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মিলনায়তনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ দাবি জানানো হয়।আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
 
তিনি বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামীম কায়সার লিংকনকে মনোনয়নের খবর দেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ তাওহিদী জনতার প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লিংকন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মতাদর্শ ও চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নন। তিনি আরও দাবি করেন, লিংকন পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও চার মাজহাবের বিরোধী এবং লা-মাজহাবি চিন্তাধারায় বিশ্বাসী।
 
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে হানাফি মাজহাবের অনুসারী। তাই ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে লিংকনকে মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ধর্মীয় সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলে আলেমদের মর্যাদা রক্ষা করা সহজ হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে।
 
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নিজেদের ইসলামবান্ধব সরকার হিসেবে দাবি করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শীর্ষ মুরুব্বি আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় উলামায়ে কেরামের দাবি উপেক্ষা করা হলে সরকার ও আলেমদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থায় দূরত্ব তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
 
মুহিউদ্দিন রাব্বানীর ভাষ্য, এ দূরত্ব তৈরি হলে তা সহজে মেরামত করা সম্ভব হবে না। তাই আলেমদের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করা সরকারের জন্য কল্যাণকর হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তারা ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে আলেম সমাজের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। ধর্মীয় বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এমন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিও জানান তারা।
 
লিংকনের পক্ষে যারা
 
অন্যদিকে, শামীম কায়সার লিংকনের নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষক। জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. ফয়জুল হক ফেসবুক পোস্টে লিংকনের নিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।
 
তিনি বলেন, একজন ভদ্র, সজ্জন, ইসলামিক জ্ঞানসম্পন্ন ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি হিসেবে শামীম কায়সার লিংকনের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া ইতিবাচক ঘটনা। ধর্মীয় জ্ঞান, আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা, দেশ-বিদেশের উচ্চতর ডিগ্রি এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে লিংকন একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তি।
 
তিনি আরও বলেন, তার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে ধর্মীয় বিশ্বাস, জ্ঞান ও আমলদারির ক্ষেত্রে লিংকন দেশের অনেক কথিত ধর্মীয় নেতা ও পীরের তুলনায়ও যোগ্য ও ব্যতিক্রমী। এটি অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থন নয় উল্লেখ করে ফয়জুল হক বলেন, লিংকনকে কাছ থেকে দেখা এবং দীর্ঘদিনের পরিচয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এ মূল্যায়ন করছেন।
 
পিরোজপুর-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী শামীম সাঈদী বলেন, শামীম কায়সার এমপি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় আন্তরিক অভিনন্দন। শামীম কায়সার লিংকন এবং আমি এ বছর একসঙ্গে পবিত্র হজ পালন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ। হজ আদায়ের সময় আমি দেখেছি, একজন সরকারি দলের প্রভাবশালী এমপি হয়েও তিনি ছিলেন আল্লাহভীরু ও বিনয়ী। তিনি সদালাপী এবং অত্যন্ত ধৈর্যশীল। লিংকন ভাইয়ের জন্য অনেক অনেক দোয়া। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অনেক মর্যাদাবান ও সম্মানিত করুন। আমিন। দাবি জানাই, দেশ থেকে যারা পবিত্র ওমরাহ ও হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে যাবেন, তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা হোক। আপনার মাধ্যমে পবিত্র হজ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও সুন্দর হোক। আমিন।
 
এছাড়াও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদ খানও লিংকনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, লিংকন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলে সমস্যা হবে—এমন যুক্তিসংগত কারণ তিনি দেখছেন না। লিংকনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, তরুণ বয়স ও গতিশীল মানসিকতা রয়েছে। এ ধরনের নেতৃত্ব ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
 
এদিকে শামীম কায়সার লিংকনের বিরুদ্ধে কওমি আলেমদের তোলা ধর্মীয় মতাদর্শসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button