প্রস্তাবিত সাইবার আইন ভিন্নমত দমনের নতুন হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে— আশঙ্কা এইচআরএসএসের

বর্তমান সরকার প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলেও কয়েকটি অস্পষ্ট, অতিরিক্ত বিস্তৃত ও দমনমূলক বিধান নতুন করে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংগঠনটির আশঙ্কা, এ খসড়া বর্তমান রূপে চূড়ান্ত হলে তা সাইবার অপরাধ দমনের পরিবর্তে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক হয়রানি এবং ভিন্নমত দমনের একটি নতুন আইনি হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতির মাধ্যমে এ আশঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
দ্য ঢাকা ডায়েরির পাঠকদের জন্য এইচআরএসএসের বিবৃতিটি তুলে ধরা হলো:
“সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, অনলাইন হয়রানি বন্ধ, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, ব্ল্যাকমেলিং, সেক্সটরশন, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন, পরিচয় চুরি, প্রতারণা ও অননুমোদিত প্রবেশের মতো অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন থাকা প্রয়োজন। তবে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) মনে করে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে কোনো আইন যেন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ন্যায়বিচার ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে সংকুচিত না করে।
সরকার প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলেও কয়েকটি অস্পষ্ট, অতিরিক্ত বিস্তৃত ও দমনমূলক বিধান নতুন করে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এইচআরএসএস-এর আশঙ্কা, খসড়াটি বর্তমান রূপে চূড়ান্ত হলে তা সাইবার অপরাধ দমনের পরিবর্তে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক হয়রানি এবং ভিন্নমত দমনের একটি নতুন আইনি হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
পূর্ববর্তী দমনমূলক আইনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন—এসব আইনের বিভিন্ন অস্পষ্ট ও ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন ধারা অতীতে সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে বহু মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া নাগরিকদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল। কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু সেই অপব্যবহারের একটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক উদাহরণ।
পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত ধারাগুলো বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং পরবর্তীতে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো তৈরির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংশোধনী খসড়ায় পূর্ববর্তী বিতর্কিত বিধানের পুনঃপ্রবর্তন সেই সংস্কার-প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
গুজব ও অপতথ্য সংক্রান্ত ধারা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুজব হিসেবে “অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য” এবং অপতথ্য হিসেবে “মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য”-এর কথা বলা হলেও এসব ধারণার প্রয়োগের সীমা ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
কোনো তথ্য অযাচাইকৃত হওয়া এবং মিথ্যা হওয়া এক বিষয় নয়। সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে “অযাচাইকৃত” তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার “আশঙ্কা”— এসব ব্যাপক ও অস্পষ্ট শব্দের ভিত্তিতে মামলা বা গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি হলে আইনের অপব্যবহার অনিবার্যভাবে বাড়বে।
মানহানি, হেয়প্রতিপন্নকরণ ও বুলিং একই ধারায় যুক্ত করার ঝুঁকি
বর্তমান আইনের ধারা ২৫ মূলত যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, সেক্সটরশন, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি ও ডিজিটাল শিশু নিপীড়নের মতো গুরুতর অপরাধ মোকাবিলার জন্য প্রণীত। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে একই ধারার আওতায় মানহানি, হেয়প্রতিপন্নকরণ ও বুলিং যুক্ত করা হয়েছে এবং শাস্তি বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নারী ও শিশুর সুরক্ষার জন্য প্রণীত একটি বিশেষ সুরক্ষা ধারার সঙ্গে মানহানি ও রাজনৈতিক বক্তব্যকে একীভূত করা আইনগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অপব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক সমালোচনা, সম্পাদকীয় কার্টুন, ব্যঙ্গ, প্রতিবাদী স্লোগান, মতামত, সামাজিক বিতর্ক কিংবা সরকারের সমালোচনামূলক বক্তব্যকে “হেয়প্রতিপন্ন” বা “মানহানিকর” হিসেবে চিহ্নিত করে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
“হেয়প্রতিপন্ন” করার প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় শব্দ, আচরণ, প্রকাশনা, অঙ্গভঙ্গি বা এমন কোনো কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা কারও মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থান কমিয়ে দেয় বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং অপব্যাখ্যার সুযোগ সৃষ্টি করে।
মিম, শেয়ার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত কনটেন্ট
প্রস্তাবিত ধারা ২৭ অনুযায়ী, কোনো কনটেন্ট শেয়ার করাকেও প্রচার হিসেবে গণ্য করা এবং সহায়তার শাস্তি মূল অপরাধের সমান করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কনটেন্ট নির্মাতা ও শেয়ারকারী ব্যক্তির মধ্যে অপরাধের মাত্রাগত পার্থক্য উপেক্ষিত হয়েছে। একইভাবে মিম, ব্যঙ্গ, প্যারোডি, কার্টুন, এআই-নির্মিত বা সম্পাদিত কনটেন্টের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যতিক্রম বা জনস্বার্থভিত্তিক সুরক্ষা না থাকলে সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, শিল্পী ও অনলাইন ব্যবহারকারীরা ফৌজদারি ঝুঁকিতে পড়বেন।
কনটেন্ট ব্লক, লাইসেন্স বাতিল ও নির্বাহী ক্ষমতা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য অনির্দিষ্ট সংস্থাকে কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিচারিক আদেশ ছাড়া কনটেন্ট ব্লক করা এবং একই কর্তৃপক্ষের কাছে আপিলের সুযোগ রাখা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এ ছাড়া কোনো কোম্পানি আইনভঙ্গ করলে তার নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল কিংবা কার্যক্রম স্থগিত করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব সংবাদমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা, লিখিত কারণ দর্শানো, নোটিশ এবং কার্যকর আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের স্বাধীনতা
প্রস্তাবিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান এবং একাধিক মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাকে সদস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ থাকলেও তাঁদের সরকার মনোনীত করবে। ফলে কাউন্সিলের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। সাইবার অধিকার, তথ্যপ্রযুক্তি, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার ও আইন বিষয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির বিধান থাকলেও বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার, কনটেন্ট ব্লক বা হয়রানির শিকার নাগরিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার ব্যবস্থার সুস্পষ্ট বিধান না থাকাটা ভারসাম্যহীন।
সরকারের কাছে এইচআরএসএস-এর সুনির্দিষ্ট দাবিসমূহ
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি সরকারকে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে—
১. প্রস্তাবিত গুজব ও অপতথ্য সংক্রান্ত ধারা পুনর্বিবেচনা অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
২. “অযাচাইকৃত”, “রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর”, “হেয়প্রতিপন্ন” ও “আশঙ্কা সৃষ্টি”–এর মতো অস্পষ্ট শব্দের পরিবর্তে নির্দিষ্ট, সংকীর্ণ ও অপব্যবহার-রোধী সংজ্ঞা দিতে হবে।
৩. মানহানি, বুলিং ও হেয়প্রতিপন্নকরণকে নারী ও শিশু সুরক্ষা-সংক্রান্ত ধারা থেকে পৃথক করতে হবে।
৪. সাংবাদিকতা, ব্যঙ্গ, কার্টুন, প্যারোডি, রাজনৈতিক সমালোচনা ও জনস্বার্থভিত্তিক মতপ্রকাশের জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা দিতে হবে।
৫. কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের আগে বিচারিক অনুমোদন এবং স্বাধীন আদালত/ট্রাইব্যুনালে আপিলের সুযোগ রাখতে হবে।
৬. মিম তৈরি ও শেয়ার করার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, জ্ঞান, ক্ষতির মাত্রা ও অপরাধে ভূমিকার ভিত্তিতে পৃথক দায় নির্ধারণ করতে হবে।
৭. সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে স্বাধীন, বহুপক্ষীয় ও দলনিরপেক্ষ করতে হবে।
৮. বেআইনি গ্রেপ্তার, কনটেন্ট অপসারণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার নাগরিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৯. সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী সমিতি, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অর্থবহ ও উন্মুক্ত পরামর্শের ভিত্তিতে আইনটি চূড়ান্ত করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা নাগরিকের অধিকার রক্ষার একটি মাধ্যম; মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের অজুহাত নয়। এইচআরএসএস মনে করে, প্রস্তাবিত সংশোধনী অবশ্যই সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ, ন্যায়বিচারের নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সংশোধনের নামে পূর্ববর্তী দমনমূলক কাঠামো পুনঃপ্রবর্তন নয়— বরং একটি নির্দিষ্ট, আনুপাতিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারসম্মত সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়নই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।”
source: The Dhaka Diary