ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে স্বাগত জানাই: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে আমরা চাই বাংলাদেশ এমন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হোক, যেখান থেকে আপনারা আরও বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, নীতির মাধ্যমে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা স্বল্পমেয়াদী লেনদেন চাই না। আমরা এমন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব চাই, যা উভয় পক্ষের জন্য মূল্য সৃষ্টি করবে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সকালে জেপি মরগ্যান আয়োজিত ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ম্যানহাটনের জেপি মরগ্যান সদর দপ্তরে। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বাণিজ্য ও আর্থিক খাতসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রাতরাশ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি ওয়াল স্ট্রিটের মানুষ নই। আমি এখানে এসেছি একজন বাংলাদেশি হিসেবে এবং একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে, যার ওপর তার দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। তাই ওয়াল স্ট্রিটের কোনো ব্যাংকারের মতো শোনানোর চেষ্টা না করে আমি বরং নিজের ভাষায় এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
তবে একটি জায়গায় মিল আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আপনাদের ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন। আর আমি কাজ করছি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায়। আমাদের দায়িত্ব ভিন্ন, কিন্তু মূলনীতি একই; উভয় পক্ষকেই সাফল্য নিশ্চিত করতে হবে। আর সে কারণেই আমি বিশ্বাস করি, আমরা একে অপরকে বুঝতে পারি।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আমি নিউইয়র্কে এসেছি। গতকাল আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছি। আজ সকালে আমি আরও সরাসরি আমাদের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ব্যবসার জন্য বাংলাদেশের যে সুযোগগুলো রয়েছে, সে বিষয়ে কথা বলতে চাই।
রাজনীতিতে আসার ব্যবসায় কর্মজীবন শুরুর কথা জানিয়ে তারেক রহমান আরও বলেন, ব্যবসা থেকে একটি সহজ শিক্ষা পেয়েছি, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আস্থা, পূর্বানুমেয়তা এবং প্রবৃদ্ধির উপযোগী সঠিক পরিবেশ। আমাদের সরকার সেই পরিবেশই নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমাদের বার্তা খুবই সহজ: বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। আমাদের রয়েছে তরুণ ও কর্মঠ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্ব বাংলাদেশকে একটি বড় উৎপাদন ও তৈরি পোশাকের কেন্দ্র হিসেবে চেনে। এটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং তা থাকবে। তবে আজকের বাংলাদেশ এর চেয়েও অনেক বেশি সম্ভাবনা ধারণ করে। জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, উৎপাদন, কৃষি এবং স্বাস্থ্যসেবায় আমরা উল্লেখযোগ্য সুযোগ দেখতে পাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবা খাতের একটি কেন্দ্রে পরিণত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে আরও সহজ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে আমরা কাজ করছি। আমরা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা, বিধিবিধান আরও সহজ করা, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের উন্নয়ন, মুনাফা সহজে দেশে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোর উন্নয়নে কাজ করছি।
তারেক রহমান বলেন, একই সঙ্গে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের উদ্যোগ নিয়েছে এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ঘনিষ্ঠ সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে জেপি মরগ্যানের ভূমিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন রেফারেন্স পয়েন্ট পেয়েছেন এবং আমাদের পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আমি বুঝি, বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত কোনো বক্তব্যের পর কী ঘটে, তার ভিত্তিতেই একটি দেশকে মূল্যায়ন করেন।
তিনি বলেন, আপনারা সবসময় জানতে চান, বিধিবিধান কতটা পূর্বানুমেয়, বিনিয়োগ কতটা সুরক্ষিত, মূলধন কতটা দক্ষতার সঙ্গে স্থানান্তর করা যায় এবং মুনাফা কতটা সহজে দেশে ফেরত নেওয়া যায়। এগুলো সম্পূর্ণ যৌক্তিক প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক আমার বিশেষ সহকারী তানভীর গনি আপনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন এবং আপনাদের স্বার্থকে আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবেন। আপনারা যেসব সুনির্দিষ্ট সুযোগ ও প্রশ্ন নিয়ে আসবেন, তারা সেগুলো নিয়ে আপনাদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সমাধানে কাজ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, আমাদের সরকারের লক্ষ্য অত্যন্ত সরল, আরও বিনিয়োগ। আরও বাণিজ্য। আরও কর্মসংস্থান। আরও প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব।
এসময় তিনি আরও বলেন, আমি আপনাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে কাজ গড়ে তুলতে আহ্বান জানাই। আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে, আপনাদের কথা শুনতে এবং যেখানে সম্ভব বাধা দূর করতে আমরা প্রস্তুত। আশা করি, আপনাদের অনেককেই শিগগিরই বাংলাদেশে দেখতে পাব।
source: Barta Bazar