বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত

পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) টুটুল চক্রবর্তীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। রাজশাহী বিমানবন্দরে নিজেকে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দিয়ে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার এবং অনুমোদিত ছুটি শুরুর আগেই বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, টুটুল চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, টুটুল চক্রবর্তী সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। গত ২৩ জানুয়ারি থেকে তাকে ‘পলাতক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর দুই দিনের কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি এবং ১৬ থেকে ১৮ নভেম্বর তিন দিনের নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর হয়েছিল টুটুল চক্রবর্তীর। তবে ছুটি শুরুর আগের দিন, ১৩ নভেম্বর, তিনি প্রয়োজনীয় প্রস্থান প্রতিবেদন দাখিল না করেই নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ওই দিন তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে নিজেকে ‘ডিআইজি, রাজশাহী রেঞ্জ’ পরিচয় দেন। এরপর রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের ডিআইজি লাউঞ্জ ব্যবহার করেন। সকাল আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, এর আগেও কয়েকবার রাজশাহী বিমানবন্দরে নিজেকে ‘ডিআইজি, রাজশাহী রেঞ্জ’ পরিচয় দিয়ে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করেছিলেন টুটুল চক্রবর্তী। বিষয়টি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসে। তার এ কর্মকাণ্ডে জনসমক্ষে পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, আইনানুগ আদেশ প্রতিপালনে অবজ্ঞা এবং বিভাগীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড ‘অসদাচরণ’ হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এসব অভিযোগে টুটুল চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। পরে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয় তাকে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি লিখিত জবাব দেননি। জবাব দেওয়ার সময় বাড়ানোর জন্যও কোনো আবেদন করেননি তিনি।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় গত ২ এপ্রিল তদন্তের জন্য একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ৭ মে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে টুটুল চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিনি ২৩ জানুয়ারি থেকে পলাতক রয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৬ জুন তাকে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে বা অন্য কোনো গুরুদণ্ড দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় ওই নোটিশে। তবে এ নোটিশেরও কোনো জবাব দেননি তিনি। পরবর্তী সময়ে অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে টুটুল চক্রবর্তীকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
এ বিষয়ে গত ২৩ জুলাই বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ চাওয়া হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর কমিশন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে বলে পরামর্শ দেয়। এরপর বিষয়টি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। গত ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি বরখাস্তের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী টুটুল চক্রবর্তীকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়।
source: The Daily Campus