এখন থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিং সরাসরি দেখতে পারবেন যাত্রীরা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সরাসরি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন যাত্রীরা। উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন ও বাছাই থেকে শুরু করে বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দেখাতে আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি বিশেষ সিসিটিভি ক্যামেরা ও ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর স্থাপন করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ উদ্যোগের ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের উদ্বেগ কমবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খান। বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদও এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে নওশাদ খান লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! আন্তরিক ধন্যবাদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তথা টিম এয়ারপোর্টকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ধন্যবাদ। দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরে উন্নত দেশের মতো লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সম্প্রচার যুগ শুরু হলো।
বিমানবন্দরের সমগ্র বেল্ট এরিয়া জুড়ে ৬৫ ইঞ্চির মোট ১৮টি 4K মনিটরে মোট ৩২ টি স্পেশাল সিসি ক্যামেরার সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে যাত্রীরা সরাসরি নিজেদের লাগেজ নামানো ও ব্যবস্থাপনা দেখতে পাচ্ছেন।’
কাওছার মাহমুদ জানান, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যাত্রীরা তাদের লাগেজ কোথায় রয়েছে এবং কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, তা সরাসরি দেখতে পারবেন। প্রতিটি লাগেজ বেল্টের ব্যাগেজ এলাকায় চারটি করে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য মনিটরে সরাসরি দেখানো হবে।
নওশাদ খান জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরে দুইভাবে উড়োজাহাজ থেকে যাত্রীদের লাগেজ নামানো হয়। বড় আকারের উড়োজাহাজে কনটেইনারে করে লাগেজ আনা হয়। এসব কনটেইনার তালাবদ্ধ অবস্থায় নামিয়ে বিশেষ বাহনে করে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাধীন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর কর্মীরা লাগেজগুলো হাতে নেন।
তিনি লেখেন, ‘অর্থাৎ এখানে লাগেজ কাটা বা কোন কিছু চুরি করার কোন সুযোগ নেই, যদি কেউ চেষ্টা করে তবে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সহ কয়েকটি সংস্থার সিসিটিভির ফুটেজে রেকর্ড হয়ে যায় ও আমরা লাইভ দেখতে পারি।’
ছোট আকারের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে কর্মীরা কার্গো হোল্ড থেকে লাগেজ নামান। এ সময় তিনজন কর্মী শরীরে ধারণ করা ক্যামেরা চালু করে কার্গো হোল্ডে প্রবেশ করেন। লাগেজ নামানোর পুরো প্রক্রিয়া ক্যামেরায় ধারণ করা হয় এবং রেকর্ড সার্ভারে আপলোড করা হয়। এসব ফুটেজ ৯০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয় বলে জানান তিনি।
নওশাদ খান লেখেন, ‘বডি অর্ণ ক্যামেরা কোনো কারণে অফ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়।
সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর।’
তিনি আরও জানান, লাগেজ নামানো ও ওঠানোর সময় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের তল্লাশি করেন একজন চেকার। কোনো লাগেজ কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে সেটির ছবি তুলে বিশেষ রেজিস্টারে নথিভুক্ত করা হয়।
লাগেজ কাটা বা চুরির অভিযোগের বিষয়ে নওশাদ খান বলেন, অনেক সময় যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছে লাগেজ খোলা বা কাটা অবস্থায় পান। তবে যাত্রার শুরুতে বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কারণে লাগেজের তালা ভাঙা হতে পারে। নিষিদ্ধ, দাহ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু থাকার সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লাগেজ পরীক্ষা করে এসব বস্তু জব্দ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এ বিষয়ে লাগেজে কোনো নোটিশ রাখা হয় না, ফলে যাত্রীদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
লাগেজ থেকে কোনো জিনিস হারালে বা লাগেজ কাটা অবস্থায় পাওয়া গেলে বিমানবন্দর ত্যাগ করার আগেই লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড কাউন্টারে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন নওশাদ খান। তিনি লেখেন, ‘আসুন প্রকৃত বাস্তবতা জানার চেষ্টা করি। ভালো কাজ থাকলে অনুপ্রাণিত করি। দেশকে ভালোবেসে দেশের যতটুকু ভালো সেটা নিয়ে গর্ব করি মানুষ কে সঠিক বিষয় জানাই।’
বিমানবন্দরে সেবা নিয়ে অভিযোগ বা পরামর্শ জানাতে হটলাইন নম্বর ১৩৬০০-তে যোগাযোগ করার কথা বলেছেন তিনি। এ ছাড়া যাত্রী অধিকার লঙ্ঘিত হলে বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ০১৩০৪০৫০৬০৩-এ অভিযোগ জানানো যাবে।
এর আগে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা ও চুরির ঘটনা প্রতিরোধে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। গত ১০ আগস্ট এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।
ছয় সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান। কমিটিতে বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির (এওসি) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহক সেবা ও কার্গো বিভাগের পরিচালক এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক সদস্য হিসেবে ছিলেন।
তদন্ত শেষে কমিটি লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছয় দফা সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার, সিসিটিভির আওতার বাইরে থাকা এলাকায় ক্যামেরা স্থাপন, কর্মীদের শরীরে ধারণ করা ক্যামেরা চালু রাখা এবং ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সিসিটিভি ফুটেজ নিরীক্ষা ও আকস্মিক পরিদর্শনের সুপারিশ করে কমিটি। যাত্রার শুরুতে বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যাত্রীকে সতর্কবার্তা পাঠানো, ই-মেইলে ছবি পাঠানো এবং ব্যাগে পরিচিতি-স্টিকার লাগানোর কথাও বলা হয়। লাগেজ চুরি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী শাস্তির সুপারিশ করে কমিটি।
বেবিচক জানিয়েছে, যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
নওশাদ খান আশা প্রকাশ করেন, লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সম্প্রচারের এ উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট কর্মী ও তদারককারীদের দায়িত্ব পালনে আরও আন্তরিক হতে সহায়তা করবে।
source: The Daily Campus