ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের খেলাপি ৫৭ হাজার কোটি টাকা

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
এক সময় ইসলামী ব্যাংক ছিল দেশসেরা। ২০১৭ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। এরপর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বের করে নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিনের ঋণ কেলেঙ্কারি, অনিয়ম ও এস আলম গ্রুপের জালিয়াতিতে এক সময়কার সবচেয়ে লাভজনক ব্যাংকটি এখন গভীর সংকটে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ ও এর কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয়দের ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৬২ শতাংশ।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন এস আলম। তিনি নিজের নামের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও ভুয়া কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে এসব ঋণ নেন। তবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে এ গ্রুপের নামে-বেনামে এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা ঋণের তথ্য উঠে এসেছে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এস আলমের ভুয়া প্রতিষ্ঠানের ঋণ তার গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এসব ঋণ খেলাপি হলেও নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি খেলাপি করা হয়। ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা নেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এস আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে দেখা গেলেও নতুন সরকারের সময় তা কিছুটা থমকে গেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের বিচার হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সরাসরি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ
ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ ও গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাইফুল আলমের পাশাপাশি আছেন তার ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ। এছাড়া সাইফুল আলমের একাধিক ভাই এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসব কোম্পানির মালিকানায় রয়েছেন।
ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে। বর্তমানে ব্যাংকটিতে এ প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণেও শীর্ষে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এরপর এস আলম রিফাইন্ড সুগারের খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি, সোনালী ট্রেডার্সের চার হাজার ৮৫৩ কোটি এবং এস আলমের মা চেমন আরার নামে করা কোম্পানি চেমন ইস্পাতের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৫৯২ কোটি টাকা।
এছাড়া গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপসের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলসের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের এক হাজার ৭৮৩ কোটি এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের এক হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যেটি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয় আনসারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ভোজ্যতেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। নথিপত্রে উল্লিখিত ঠিকানায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব নেই। মূলত এটি একটি নামসর্বস্ব ‘কাগুজে’ প্রতিষ্ঠান।
তাছাড়া সাইফুল আলমের ভাগনে মোস্তান বিল্লাহ আদিলের আদিল করপোরেশনের খেলাপি ঋণ এক হাজার ২৮১ কোটি এবং আদিলের স্ত্রী সাদিয়া জামিলের সাদিয়া ট্রেডার্সের খেলাপি ঋণ এক হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এছাড়া আইডিয়াল ফ্লাওয়ার মিলসের এক হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, ইউনাইটেড সুপার ট্রেডের এক হাজার ১৩৪ কোটি, সিলভার ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের এক হাজার ১৩৭ কোটি এবং মুরাদ এন্টারপ্রাইজের এক হাজার ১১৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। মুরাদ এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ যে বিনিয়োগের কথা বলে ঋণ নিয়েছিল, তা না করে এস আলম তার বিভিন্ন ব্যবসার ঋণ পরিশোধে এ টাকা ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে তারা মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছেন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকার শীর্ষ পাঁচটিসহ ১১টি প্রতিষ্ঠান এস আলমের মালিকানাধীন।
পরোক্ষ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ
ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির ১৫টি এস আলম গ্রুপের। সরাসরি ঋণ ছাড়াও বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরোক্ষ সুবিধাভোগী এ গ্রুপের পাশপাশি নাবিল গ্রুপ। এ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ পাঁচ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের খেলাপি ঋণ এক হাজার ১৮০ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল প্রোডাক্ট প্যালেসের এক হাজার ১৭৪ কোটি, জামান সিন্ডিকেটের এক হাজার ৫১ কোটি, সুলতান অ্যাসোসিয়েটের এক হাজার ১৪০ কোটি এবং মার্কেট মাস্টার এনলাইজারের এক হাজার ১৪৪ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এস আলমের বিরুদ্ধে ব্যাংক দুই ধরনের মামলা করেছে। কারণ, তার লেনদেনের মধ্যে সিভিল ও ক্রিমিনাল পার্ট ছিল। সীমার মধ্যে যেসব ঋণ নিয়েছে, তার জন্য সিভিল মামলা করা হয় আর ম্যানিপুলেট করে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে, তার জন্য ক্রিমিনাল মামলা করে ব্যাংক। এখন পর্যন্ত এস আলমের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে ২৪টি মামলা করেছে ইসলামী ব্যাংক। এনআই অ্যাক্টে করা হয়েছে ৩৬৮টি মামলা। এছাড়া এস আলমের সঙ্গে জড়িত কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এস আলমের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, এস আলম গ্রুপের ঋণ আদায় হচ্ছে না। তারা ঋণ পরিশোধের জন্য এগিয়ে আসছে না। যেহেতু মামলা হয়েছে, তাই এখন আইনিভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনটি অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি বা নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করা হয়েছে।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লুটপাটের কারণে ব্যাংকের ক্ষতি হলেও তা গোপন রাখা হয়। ওই সময় তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকের চলতি হিসাব ঘাটতিতে পড়ে যায়। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার অবৈধভাবে লেনদনে করার সুযোগ দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলো বিধিবদ্ধ নগদ তারল্য সংরক্ষণ হিসেবে সিআরআর এবং সরকারি সিকিউরিটিজ হিসেবে এসএলআর রাখতেও ব্যর্থ হয়। আবার এস আলমের নেওয়া ঋণ খেলাপি হলেও তা দেখানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে। নতুন বোর্ড এসে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা বের করে। এতে দেখা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছাড়িয়ে যায় এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে সেখান থেকে এখন ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক হিসাবের ঘাটতি পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকটি এখন নিয়মিত সিআরআর ও এসএলআর রাখতে পারছে। গ্রাহকের আমানতের অর্থও যথাযথ সময় ফেরত দিতে পারছে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
নতুনে করে এস আলমের ফেরার চেষ্টা
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর বিভিন্নভাবে এস আলম সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। তার সময়কার নিয়োগ পাওয়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের (বর্তমানে চাকরিচ্যুত) দিয়ে আন্দোলন করাচ্ছেন। গত রোববার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে তার অনুসারী ও চাকরিচ্যুতরা বড় শোডাউন করে আগের মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক এখন পর্যন্ত চার হাজার ৬৮৫ কর্মীকে বরখাস্ত করেছে। এসব কর্মীকে এস আলম গ্রুপ যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনেই নিয়োগ দিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: dailyamardesh.com

