গত বছরের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতের রাফালসহ আটটি বিমান ফেলে দেওয়ার পর থেকে চীনা যুদ্ধবিমানের বিক্রি তুঙ্গে

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার আকাশযুদ্ধের পর— চীনা যুদ্ধবিমানের চাহিদায় আকস্মিক উল্লম্ফন, আধুনিক সমরাস্ত্র বিক্রির কৌশলে এক নতুন শিক্ষা দিয়ে গেল। বহু বছর ধরে অনেক ক্রেতা দেশ চীনা যুদ্ধবিমানকে পশ্চিমা বা রাশিয়ান প্ল্যাটফর্মের সস্তা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু পাকিস্তান যখন চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ফ্রান্সের তৈরি রাফালসহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার তথ্য দিল, তখন সেই চিরচেনা ধারণায় আমূল পরিবর্তন আসে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে চীনের তৈরি পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান অন্তত দুটি ভারতীয় সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে। রয়টার্সের অন্য এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের রাফাল ভূপাতিত হওয়ার পেছনে চীনের পিএল-১৫ মিসাইলের পাল্লা বা রেঞ্জ সম্পর্কে ভারতের ভুল হিসাব বড় ভূমিকা রেখেছিল।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই অভাবনীয় পারফরম্যান্স সংশ্লিষ্ট চীনা কোম্পানির বিক্রিতে তাৎক্ষণিক জোয়ার এনে দিয়েছে। জে-১০ সিরিজের প্রস্তুতকারক চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন (সিএসি, এভিআইসি-র একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের আয় ১৫.৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭৫.৪ বিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার) দাঁড়িয়েছে; যেখানে লাভ ৬.৫ শতাংশ বেড়ে ৩.৪ বিলিয়ন ইউয়ান হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার সমান। প্রতিটি নতুন ক্রয়াদেশই কেবল পাকিস্তানের পারফরম্যান্সের কারণে এসেছে—তা শতভাগ প্রমাণ করা অসম্ভব হলেও, সময়ের এই সংযোগটি উপেক্ষা করার মতো নয়।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে, যুদ্ধক্ষেত্রে সেটির পারফরম্যান্সই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী বিজ্ঞাপন। পাকিস্তান ২০২২ সালে জে-১০সি বিমান বহরে যুক্ত করেছিল, যাকে রয়টার্স পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জন্য একটি 'মেজর আপগ্রেড' বা বড় আধুনিকায়ন হিসেবে বর্ণনা করেছিল। ২০২৫ সালে ভারতের সাথে সংঘর্ষের পর এই যুদ্ধবিমানটি 'ব্যাটল-টেস্টেড' বা যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সক্ষমতার মর্যাদা লাভ করেছে।
অবশ্য ওই সংঘর্ষে জে-১০সি-র প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ভারত তাদের বিমান হারানোর কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত প্রকাশ করেনি; অন্যদিকে পাকিস্তানের বড় বড় দাবিগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় বিমান বাহিনী বলেছে— "যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধেরই অংশ"। আবার ভারত নিজেও পাকিস্তানের বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। সত্য সম্ভবত উভয় পক্ষের প্রকাশ্য বর্ণনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। তবুও, পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ আসার আগেই সমরাস্ত্র বাজার প্রায়ই ধারণা বা পারসেপশনের ওপর ভিত্তি করে সামনে এগিয়ে যায়।
জে-১০সি-র এই সাফল্য একটি বৃহত্তর চিত্রের অংশ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) ২০২৫ সালের সমরাস্ত্র স্থানান্তর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সময়কালে পাকিস্তান বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়। এই সময়ে দেশটির সামরিক সরঞ্জাম আমদানি ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই সরবরাহ করেছে চীন। পাকিস্তান কেবল এক ক্রেতাই নয়, বরং চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রদর্শনী ক্ষেত্র।
২০২৫ সালের জুনে রয়টার্স জানিয়েছিল যে, ইন্দোনেশিয়া খরচ, সামঞ্জস্যতা এবং বিক্রয়োত্তর সেবার কথা বিবেচনা করে চীনের জে-১০ বিমানটি কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে। অক্টোবরের মধ্যে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, ইন্দোনেশিয়া অন্তত ৪২টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে, যার বাজেট ধরা হয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি একটি বড় ধরণের কৌশলগত সংকেত।
তবে রাফালকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলা ঠিক হবে না। এটি এখনও বিশ্বের অন্যতম সম্ভ্রমের চোখে দেখা মাল্টি-রোল ফাইটার বা বহুমুখী সক্ষমতার যুদ্ধবিমান। ডাসো অ্যাভিয়েশন রাফালকে উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধ মিশনের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রচার করে। ২০২৫ সালে ভারত ফ্রান্সের সাথে তার নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি রাফাল-মেরিন বিমান কেনার চুক্তি সই করেছে। ডাসো নিশ্চিত করেছে যে, এগুলো ভারতীয় বিমান বাহিনীতে আগে থেকে থাকা ৩৬টি রাফালের সাথে যুক্ত হবে।
তবে সুনাম বা ব্র্যান্ড ভ্যালু একটি বড় বিষয়, আর রাফালের ক্ষতি এখানে চীনের লাভে পরিণত হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) মতে, ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর— চীন রাফাল বিক্রি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স-ও ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের বরাত দিয়ে একই ধরণের অভিযোগের কথা জানিয়েছে। চীন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও এই বিতর্কটিই প্রমাণ করে যে, আকাশযুদ্ধ এখন তথ্য যুদ্ধের (ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার) স্তরেও বিস্তৃত হয়েছে।
জে-১০সি হয়তো সব জায়গায় পশ্চিমা ফাইটারগুলোর জায়গা নিতে পারবে না। আর ক্রেতা দেশগুলো এখনও রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টিগ্রেশন এবং রাজনৈতিক নির্ভরতা নিয়ে চিন্তিত থাকবে। কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসের পর চীন এখন জোরালোভাবে বলতে পারে যে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় বিকল্পের চেয়ে সস্তাই নয়, বরং এগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত। এই কারণেই সিএসি-র বিক্রিতে এই উল্লম্ফন কেবল একটি কোম্পানির ব্যালেন্স শিটের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত-পাকিস্তান সংঘাত মূলত বিশ্ববাজারের কাছে চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাকে নতুন করে উন্মোচিত করেছে।
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: thedeltalens.com

