ফিলিস্তিনিদের দমনে ইসরাইলের ‘পশু-যুদ্ধ’, নতুন অস্ত্র বেন গভিরের কুমির

চলতি মাসের শুরুতে, ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির ঘোষণা করেন যে, ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের পাহারা দেওয়ার জন্য ইসরাইল নীল নদের কুমির ব্যবহার করবে।
নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বন্দিশালা ‘কেতজিওট’ থেকে এ কর্মসূচিটি শুরু হবে। প্রথম ইন্তিফাদার সময় (১৯৮৮-১৯৯৫) এই কারাগারটি একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে আটকে রাখা হয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের কাছে এটি ‘আনসার ৩’ ক্যাম্প নামে পরিচিত ছিল।
বেন গভিরের এই কুৎসিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য ইসরাইলের পরিবেশ সুরক্ষামন্ত্রী ইদিত সিলম্যান কুমিরকে ‘চাষ করা বন্য প্রাণী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এই নতুন শ্রেণিবিন্যাসের এই সরীসৃপ প্রাণীগুলোকে পরিখায় ছেড়ে দেওয়া হবে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের বন্দী করে পশুর মতো আচরণ করা হয়।
বেন গভির ফ্লোরিডার নতুন অভিবাসী আটক কেন্দ্র ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যা গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিদর্শন করেছিলেন। ভয়াবহ সেই কারাগারটি একটি বিশাল উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমিতে অবস্থিত, যা অ্যালিগেটর, কুমির এবং পাইথনে ভরা। এটি মূলত এক ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা আরেকটি উপনিবেশের অনুপ্রেরণা লাভের ঘটনা।
পশু-যুদ্ধের শুরু ইসরাইলের শব্দ চয়ন ও অমানবিকীকরণ
ফিলিস্তিনিদের উপর আধিপত্য ও নিপীড়ন চালানোর এবং ভূখন্ডটিকে তার কল্পিত হিব্রু অতীতে ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ ইসরাইলি কৌশলে পশুরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জায়নবাদী ও ইসরায়েলি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন, এবং প্রায়শই তাদের প্রজাতি নির্দিষ্ট করে দেন।
উদাহরণস্বরূপ, গাজায় গণহত্যা শুরু করার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে ইসরাইলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ফিলিস্তিনিদের ‘মানব পশু’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
এর বিপরীতে, ১৯৬০-এর দশক এবং ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দায়ান ফিলিস্তিনিরা কোন প্রজাতির পোকামাকড় বা স্তন্যপায়ী প্রাণীর সাথে সবচেয়ে বেশি মিলে তা ঠিক করতে পারেন, তাদের তাচ্ছিল্যভরে ‘বলতা’ ও ‘কুকুর’ বলে অভিহিত করতেন।
১৯৮০-এর দশকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিন তাদের ‘দুই পায়ের পশু’ হিসেবে আখ্যা দেন, অন্যদিকে ইসরাইলের সাবেক চিফ অফ স্টাফ রাফায়েল এইতান তাদের আবার ‘তেলাপোকা’ হিসেবে অবনমিত করেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক শামির ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘ফড়িং’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলো, ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক ফিলিস্তিনিদের ‘কুমির’ বলে বর্ণনা করেন। বেন গভিরের পরিকল্পনা, যা মনে হচ্ছে, তা হলো রূপক কুমিরদের পাহারা দেওয়ার জন্য আসল কুমির রাখা।
গাজায় প্রাণিসম্পদ ধ্বংস: ২০২৩ সালের নভেম্বরে আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি লেখক ও কবি রিফাত আল-আরির গাজা সিটির ধ্বংসপ্রাপ্ত চিড়িয়াখানায় মৃত ও অনাহারী প্রাণীদের চিত্র তুলে ধরেন। এর এক সপ্তাহ পরেই ইসরাইলি হামলায় তিনি ও তার পরিবার নিহত হন।
ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিনিয়তই গবাদি পশু ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গৃহপালিত পশু চুরি করে থাকে। এমনিভাবে ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনিদের স্থানীয় বিষধর সাপ চুরি করে সেটিকে পরবর্তীতে ইসরাইলের ‘জাতীয় সাপ’ হিসেবে ঘোষণা করে।
পশু, বিশেষ করে সাপ নিয়ে জায়নবাদী উদ্বেগের সূত্রপাত হয় জায়নবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেলের সময় থেকে, যিনি তার ডায়েরিতে ফিলিস্তিনের আদিবাসী ও পশুদের নিয়ে কী করা উচিত তার রূপরেখা দিয়েছিলেন।
• ঐতিহাসিক পটভূমি: ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ফিলিস্তিনি বিপ্লবীদের ওপর সহিংস কুকুর লেলিয়ে দিত। ১৯৬৭ সালের পর থেকে ইসরাইল কুকুর, বুনো শুয়োর, ভেড়া, গরু, হরিণ ও বুনো গাধাকে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
বন্যপ্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার
• বুনো শুয়োর ছেড়ে দেওয়া: ২০০৯ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি লোকালয় ও কৃষিজমিতে বুনো শুয়োর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী অবরুদ্ধ নূর শামস শরণার্থী শিবিরের পাশের ইকতাবা গ্রামে ১৮টি বুনো শুয়োর ছেড়ে দেয়, যা ফিরে আসতে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
• কুকুর বাহিনীর আক্রমণ: নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রশিক্ষিত কুকুর এনে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক ও বন্দিদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ ধরনের ক্যানাইন হামলায় অন্তত ১৪৬টি ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যার মধ্যে ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ২৪ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি যুবক মোহাম্মদ ভর নিহত হন।
• আইনি বৈপরীত্য: ২০০৩ সালে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট হাঁস-মুরগীকে জোরপূর্বক খাওয়ানোকে নির্যাতন আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করে। অথচ ২০১৫ সালে একই বিচার ব্যবস্থা ফিলিস্তিনি অনশনকারী বন্দিদের জোরপূর্বক খাওয়ানোকে আইনি বৈধতা দেয়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এমএমআর
source: Daily Amar Desh