News
নবম পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, প্রজ্ঞাপন কবে— কোন গ্রেডে বাড়ছে কত বেতন?

দীর্ঘ ১১ বছর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডে নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় পর্যালোচনা করা হয়। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নতুন বেতনস্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা One Rank One Pension (OROP) চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে এটি একসঙ্গে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এর বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগের অবসরপ্রাপ্ত বেসামরিক কর্মচারীদের তথ্য না থাকায় OROP পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কম পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন।
সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে। এতদিন নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা এ সুবিধা পেতেন। নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।
একসঙ্গে নয়, তিন ধাপে বেতন
নতুন বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় পুরো বেতনস্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বল্প আয়ের কথা বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে নিট পেনশন বাড়ানো হবে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতনস্কেলের মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের আশা, পর্যায়ক্রমে বেতনস্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
উপকার পাবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে Medium Term Budget Framework অনুযায়ী এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। সরকার মনে করছে, নতুন বেতনস্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়াবে। একই সঙ্গে দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
প্রজ্ঞাপন কবে?
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর করতে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব নথিতে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে অনুমোদিত বেতনস্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এখন বাস্তবায়নের বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনার অপেক্ষা।
কোন গ্রেডের বেতন কত?
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রেডের বেতন স্কেল হলো— গ্রেড ১: টাকা ১৫৬০০০ (নির্ধারিত); গ্রেড ২: টাকা ১৩২০০০-১৫৩০০০; গ্রেড ৩: টাকা ১১৩০০০-১৪৮৮০০; গ্রেড ৪: টাকা ১০০০০০-১৪২৪০০; গ্রেড ৫: টাকা ৮৬০০০-১৩৯৭০০; গ্রেড ৬: টাকা ৭১০০০-১৩৪০০০; গ্রেড ৭: টাকা ৫৮০০০-১২৬৮০০; গ্রেড ৮: টাকা ৪৬০০০-১১০৮০০; গ্রেড ৯: টাকা ৪৪০০০-১০৫৯০০; গ্রেড ১০: টাকা ৩২০০০-৭৭৩০০; গ্রেড ১১: টাকা ২৫০০০-৬০৫০০; গ্রেড ১২: টাকা ২৪৩০০-৫৮৭০০; গ্রেড ১৩: টাকা ২৪০০০-৫৮০০০; গ্রেড ১৪: টাকা ২৩৫০০-৫৬৮০০; গ্রেড ১৫: টাকা ২২৮০০-৫৫২০০; গ্রেড ১৬: টাকা ২১৯০০-৫২৯০০; গ্রেড ১৭: টাকা ২১৪০০-৫১৯০০; গ্রেড ১৮: টাকা ২১০০০-৫০৯০০; গ্রেড ১৯: টাকা ২০৫০০-৪৯৬০০ এবং গ্রেড ২০: টাকা ২০০০০-৪৮৪০০।
source: The Dhaka Diary