অস্ত্রোপচার থেকে ছড়াচ্ছে যক্ষ্মা

অস্ত্রোপচারের পর শুকাচ্ছিল না ক্ষত। পরীক্ষা করে এক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হওয়া ১২ জনের মধ্যে পাওয়া গেছে যক্ষ্মা। আরেক ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের সময় বেশ কিছু প্রসূতির শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটেছে। যক্ষ্মাবিশেষজ্ঞ, প্রসিূতিরোগ বিশেষজ্ঞ, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলা হয়, পাবনার ফরিদপুর উপজেলা সদরের আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটালে অস্ত্রোপচার হওয়া ১২ জন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এই হাসপাতালে গত মে-জুন মাসে প্রায় ১২০ জন প্রসূতির প্রসব হয় অস্ত্রোপচারে। তাদের মধ্যে ১১ জন প্রসূতি হাসপাতাল থেকে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হওয়া এক ব্যক্তিরও ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা ধরা পড়েছে।
এদিকে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকে প্রসবে অস্ত্রোপচারের সময় বেশ কিছু প্রসূতির শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটে।
উপজেলা সদরের থানাপাড়ার বাসিন্দা জয়া রানী দাস। বয়স ২০ বছরের কাছাকাছি। চলতি বছরের ২২ মে তাকে আল-মদিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিনই অস্ত্রোপচারে তার সন্তানের জন্ম হয়। ২৪ মে হাসপাতাল থেকে সন্তানসহ বাড়ি ফিরে ২৯ মে আবার হাসপাতালে গিয়ে সেলাই কাটাসহ ক্ষতস্থান ড্রেসিং করে বাড়ি ফেরেন। চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খান। কিন্তু দুই সপ্তাহ পরও ক্ষতস্থান শুকায়নি।
জয়া রানী ও তার বাবার ভাষ্যমতে, অস্ত্রোপচারের পুরো জায়গা শুকাচ্ছিল না। পুঁজ জমতে থাকে, রস বের হতে থাকে। একাধিকবার হাসপাতালে যান জয়া। চিকিৎসক ওষুধ দেন, কিন্তু ক্ষত শুকায় না।
একপর্যায়ে ক্ষতস্থান থেকে মাংসের নমুনা পাঠানো হয় রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। জয়া রানীকেও পাঠানো হয় রাজশাহীতে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষায় ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। এরপর দ্রুতই জয়াকে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে যক্ষ্মার ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কাগজপত্রে দেখা যায়, ২৫ জুলাই থেকে জয়া রানী যক্ষ্মার ওষুধ খাওয়া শুরু করেন।
এ ঘটনার বিষয়ে ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটালে মে-জুনে অস্ত্রোপচার হওয়া ১২ জনের পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে।
ওই হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কিছুটা পুরোনো জানিয়ে জেলা সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ওই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে ঘটনাটি জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে জানানো হয়েছে। অনুসন্ধানেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
১০ শয্যাবিশিষ্ট আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটাল। ১০ শয্যার হাসপাতাল হওয়ার যে শর্ত রয়েছে, সেসব শর্ত পুরোপুরি না মেনেই ২০২০ সাল থেকে হাসপাতালটি চলছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ রানা জানান, এই হাসপাতালে দৈনিক দু-তিনটি প্রসব হয় অস্ত্রোপচারে। মাসে ৬০ থেকে ৭০টি অস্ত্রোপচার হয়। প্রসবে অস্ত্রোপচারই এই হাসপাতালের আয়ের প্রধান উৎস।
এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকে প্রসবে অস্ত্রোপচারের সময় বেশ কিছু প্রসূতির শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যৌথভাবে জুন মাসে এ ঘটনার তদন্ত করে সত্যতা পায়।
শনিবার ভেদরগঞ্জ উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল গণমাধ্যমকে বলেন, একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার হওয়া ৫১ জনের শরীরে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল। মার্চ মাস থেকে ক্লিনিকটি এবং ক্লিনিকের অস্ত্রোপচারকক্ষ বন্ধ আছে। তবে ডায়াগনস্টিক সেবাটি চালু রাখা হয়েছে।
চিকিৎসাশাস্ত্র বলছে, ফুসফুস ছাড়াও শরীরের অন্য বেশ কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যক্ষ্মা হয়। এসব যক্ষ্মাকে বলা হয় ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা বা এক্সট্রা-পালমুনারি টিবি। যক্ষস্থানে যে যক্ষ্মা হচ্ছে, সেটিও ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা। এ যক্ষ্মার চিকিৎসা ও নিয়মিতভাবে প্রতিদিন যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করতে হয়।
source: Asia Post