ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে ভারতের সঙ্গে ১৫ বছরের অস্বস্তিকর সম্পর্কের পর বাংলাদেশ এখন নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
জাতিসংঘ সফরের আগে কিংবা সফরের সাইডলাইনে ভারতের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও ভালো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ একটি দ্বিপক্ষীয় সফরকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো বহুপক্ষীয় ফোরামে গিয়ে অন্য দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে না।
তিনি বলেন, “আমি বলিনি যে প্রতিটি বহুপক্ষীয় জায়গায় গেলে আমরা কাউকে মিট করব না। দুটি বিষয় আলাদা।”
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমরা একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাই। আমরা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চাই। এতদিন একটি ঝামেলাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ, লুটেরা, স্বৈরাচার সরকারের সঙ্গে ১৫ বছরের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এখন একটি নতুন সম্পর্কের দিকে যাব। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই করব।”
তবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে ভারতের সঙ্গে কোনো বৈঠক হবে না—এমন ধারণা সঠিক নয় বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘এর অর্থ এই নয় যে, বহুপক্ষীয় যেকোনো জায়গায় গেলে প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আমরা সাইডলাইনে বৈঠক করব না। সেটি কখনই বলা হয়নি।’
ভারত নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন না করে নিজেদের দেশের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ডেইলি ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট খাইতেই ইন্ডিয়া, লাঞ্চ খাইতেই ইন্ডিয়া, ডিনার খাইতেই ইন্ডিয়া—তাহলে ভাই, আপনার নিজের দেশের খাবার কোন সময় খাবেন? খালি যদি ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া করেন! নিজের দেশের চিন্তা করেন।”
তিনি আরও বলেন, “যার সঙ্গে যখন আমাদের দ্বিপক্ষীয় (বৈঠক) করতে হবে, বহুপক্ষীয় ফোরামে গিয়ে কথা বলতে হবে, আমরা তা করব। যেখানে যে সুযোগ থাকবে, আমরা সম্পৃক্ত হব। নেতারা সবার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। অনেক আমন্ত্রণ থাকে। সাইডলাইনে অনেক অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নেব।”
সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, “এসব বিষয় ভারতের জাতীয় সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করা হবে। সীমান্ত ও সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত প্রটোকল রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কাঠামোগত চুক্তিও রয়েছে।” এসব ব্যবস্থার আওতায় উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রতিটি পর্যায়ে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০১টি চুক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং সংসদীয় কমিটিতে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’’ এ বিষয়ে চিফ হুইপের কাছে জানতে সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ভিশন তুলে ধরবেন বলেও জানান হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করার সম্ভাবনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরকালে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক করবেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, টেকসই সমাধান এবং সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশের ভূমিকার বিষয়ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে থাকবে।”
এ ছাড়া দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্থানীয় অর্থনীতিতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা তৈরি, বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ এবং জলবায়ু নিরাপত্তা ও জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিষয়গুলোও ভাষণে স্থান পেতে পারে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘‘তবে কার কার সঙ্গে বৈঠক হবে, তা চূড়ান্ত হতে সময় লাগতে পারে।’’ বহুপক্ষীয় ফোরামে এ ধরনের বৈঠক অনেক সময় শেষ মুহূর্তেও নির্ধারিত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সাইডলাইনে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা আয়োজন করা হবে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি ‘টপ প্রায়োরিটি’। জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। পুরো সভাপতিত্বের সময়জুড়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বজায় রাখার কথাও জানান তিনি।
source: The Dhaka Diary