জ্বালানি তেলের দামে ইতিহাসের রেকর্ড, ৭ মাসে লিটারে বেড়েছে ৩৫–৪৫ টাকা

দেশে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন—চার ধরনের জ্বালানির দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়েছে।
নতুন দাম অনুযায়ী, ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) জারি করা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নতুন দাম নির্ধারণের কথা জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি এখনও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে দেশে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাসে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম ছিল যথাক্রমে ১০০, ১১২, ১১৬ ও ১২০ টাকা। এই দাম ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছিল এবং মার্চ ও এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত বহাল ছিল।
এরপর এপ্রিলের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বাড়ার কারণে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় করা হয়। ১৮ এপ্রিল রাতে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে দাম দাঁড়ায় যথাক্রমে ১১৫, ১৩০, ১৩৫ ও ১৪০ টাকা।
ওই সময় মার্চের শেষ দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে গত জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়। তবে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুনের ওই দাম জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত বহাল ছিল।
জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৪৪ টাকা থেকে বেড়ে ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ এ সময়ে দাম বেড়েছিল ১৪২ শতাংশ। পেট্রোল ও অকটেনের দাম যথাক্রমে ৭৪ ও ৭৭ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ ও ১২৭ টাকা হয়। এ দুই জ্বালানির দাম বেড়েছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপের কথা উল্লেখ করে ওই সময়ে কয়েক দফা জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়। সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি হয় ২০২২ সালের ৫ আগস্ট। ওই রাতে চার ধরনের জ্বালানির দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। অকটেনের দাম ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পেট্রোলের দাম ৫১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে ডিজেলের দাম এক লাফে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়।
২০২৪ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মাসিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়। একই বছরের আগস্টে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে কয়েক দফা জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অকটেন ও পেট্রোলের দাম ছয় টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা কমানো হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার ধরনের তেলের দাম এক টাকা করে বাড়লেও জুনে ডিজেল দুই টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেন তিন টাকা করে কমানো হয়। ডিসেম্বরে আবার চার ধরনের তেলের দাম দুই টাকা করে বাড়ে।
এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরও দুই দফায় চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি দুই টাকা করে কমানো হয়। ফেব্রুয়ারির সর্বশেষ সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা।
source: The Dhaka Diary