News

বিশ্বের ১০০-তে নেই শাহজালাল বিমানবন্দর, ঠাঁই হয়নি দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশেও

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর© সংগৃহীত

মালামাল হারানো, লাগেজ কাটা, যাত্রী সেবায় অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর হয়রানিসহ নানা অভিযোগ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিয়ে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের র্যাংকিংয়েও একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে এটি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাইট্র্যাক্স এর সেরা ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় স্থান পায়নি শাহজালাল বিমানবন্দর। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশটি বিমানবন্দরের তালিকাতেও ঠাঁই হয়নি। এভিয়েশন খাত এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, এটা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জার।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, “সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রীর চাপ নিতে হয় শাহজালালকে। থার্ড টার্মিনাল চালু হয়ে গেলে এই দুরবস্থা আর থাকবে না।” 

যদিও এই কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম। তিনি বলেন, “থার্ড টার্মিনাল হলে কী হবে? থার্ড টার্মিনাল হলে একটা আরও খুব সুন্দর ভবন হবে। কিন্তু যারা এখন বিমান বন্দর ব্যবস্থাপনা করছে, সেবা দিচ্ছে বা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে- তার তো একই থাকছে। তাদের সেবার মান না বাড়ালে পরিস্থিতি একই থেকে যাবে।”

বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী, পর্যটক ও ব্যবসায়ী এই পথ দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বিদেশীদের চোখে বাংলাদেশের প্রথম চিত্রও তৈরি হয় এখানেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে এই বিমানবন্দরের চেহারা হতাশাজনক। বিমানবন্দরের মান যাচাইয়ে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাইট্র্যাক্স (Skytrax)। প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডস (World Airport Awards) ২০২৬-এ বিশ্বের সেরা ১০০ বিমানবন্দরের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে শাহজালালের নাম নেই। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সেরা দশেও ঠাঁই হয়নি ঢাকার। অথচ প্রতিবেশী ভারতের পাঁচটি বিমানবন্দর বিশ্বসেরা ১০০-তে জায়গা করে নিয়েছে, আর প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেসব বিমানবন্দর দিয়ে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন, তার বেশির ভাগই রয়েছে তালিকার ওপরের দিকে।

স্কাইট্র্যাক্সের এই র‍্যাংকিং তৈরি হয় যাত্রীদের ভোটে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা জরিপে ১০০টির বেশি দেশের যাত্রী অংশ নেন। মূল্যায়ন করা হয় ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দর। চেক-ইন, আগমন, ট্রানজিট, কেনাকাটা, নিরাপত্তা তল্লাশি ও ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পুরো যাত্রা নিয়ে যাত্রীদের মত নেয়া হয়। গত ১৮ মার্চ লন্ডনে এই ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

এতে টানা ১৪তম বারের মতো এবারও বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর হয়েছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমান বন্দর। দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন, তৃতীয় জাপানের টোকিও হানেদা। সেরা পাঁচের সবগুলোই এশিয়ার। এর মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবারের প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়।

৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দরের মধ্যে সেরা ১০০-তে নাম না থাকা মানে শাহজালাল তালিকার নিচের দিকের বিশাল অংশে পড়ে আছে। তবে প্রকাশিত ১০০টির বাইরের বিমানবন্দরগুলোর আলাদা ক্রম স্কাইট্র্যাক্স জানায় না। তাই শাহজালাল ঠিক কত নম্বরে, তা নির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ নেই।

প্রতিবেশী এগোচ্ছে, ঢাকা নেই দৃশ্যপটে
দক্ষিণ এশিয়া থেকে বিশ্বসেরা ১০০-তে জায়গা পেয়েছে কেবল ভারত। দেশটির পাঁচটি বিমানবন্দর এই তালিকায় আছে, আর পাঁচটিই আগের বছরের চেয়ে ওপরে উঠেছে। সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে গোয়ার মনোহর বিমানবন্দর ৮০তম থেকে ৬৪তম। হায়দ্রাবাদ উঠেছে ১৩ ধাপ। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল বা বাংলাদেশের কোনো বিমানবন্দর এই তালিকায় নেই। দিল্লী বিমানবন্দর ৩২ থেকে ২৮তম ধাপে উন্নীত হয়েছে। ৭ ধাপ এগিয়ে ব্যাঙ্গালোর বিমানবন্দরের অবস্থান ৪১তম, ১৩ ধাপ এগিয়ে হায়দ্রাবাদ ৪৩তম, ৭ ধাপ এগিয়ে মুম্বাই বিমানবন্দরের অবস্থান ৬৬তম।

বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া। সেখানকার যে বিমানবন্দরগুলো দিয়ে প্রবাসীরা দেশে ফেরেন, তার প্রায় সব কটি’ই বিশ্বসেরা ১০০-তে। দুবাই ১৩তম, সৌদি আরবের রিয়াদ ১৪তম। রিয়াদ এক বছরে ২৪তম থেকে উঠে এসে এবার বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতি করা বিমানবন্দরের পুরস্কারও জিতেছে। বাহরাইন বিমানবন্দর ২০তম, আবুধাবি ২৪, জেদ্দা ২৭, মাদিনা ৫০, দাম্মাম ৫৩, কুয়ালালামপুর ৬০ এবং মাসকাট বিমানবন্দরের অবস্থান ৬৮তম।

অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন প্রবাসী শ্রমিক রিয়াদ বা দুবাইয়ের বিশ্বসেরা ২০-এর একটি বিমানবন্দর থেকে উড়ে এসে নামেন এমন এক বিমানবন্দরে, যার নাম সেরা ১০০-তেও নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্রও একই রকম ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ২২তম, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক সুবর্ণভূমি ৩৬তম, ভিয়েতনামের হ্যানয় ৭১তম।

দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশে নয়টিই ভারতের
বিশ্ব তালিকার পাশাপাশি স্কাইট্র্যাক্স প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা সেরা দশও প্রকাশ করে। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশে নয়টিই ভারতের বিমানবন্দর। একমাত্র ব্যতিক্রম শ্রীলঙ্কার কলম্বো, যার অবস্থান সপ্তম। শীর্ষে দিল্লি, যা অঞ্চলের সেরা বিমানবন্দরের পুরস্কারও পেয়েছে। কর্মীদের সেবায় অঞ্চলের সেরা হয়েছে হায়দ্রাবাদ, আর আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে সেরা ব্যাঙ্গালোর।

দক্ষিণ এশিয়ার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- চেন্নাই, কোচিন, আহমেদাবাদ ও কলকাতা বিশ্বসেরা ১০০-তে না থাকলেও আঞ্চলিক তালিকায় ঢাকার আগে জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে চেন্নাইয়ের মানসনদ ঢাকার মতোই ২-স্টার। অর্থাৎ সুযোগ-সুবিধার মানে সমান স্তরে থেকেও যাত্রীদের ভোটে চেন্নাই দক্ষিণ এশিয়ার ষষ্ঠ সেরা, অথচ ঢাকা দশের মধ্যেও নেই। প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার বিমানবন্দরও ঢাকাকে পেছনে ফেলেছে। পাকিস্তানের করাচি ও লাহোর, নেপালের কাঠমান্ডু কিংবা মালদ্বীপের মালে এ অঞ্চলের আরও কয়েকটি রাজধানী বা প্রধান বিমানবন্দরও এই সেরা দশে নেই। ফলে ঢাকার অনুপস্থিতি একক ঘটনা নয়। তবে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে শাহজালাল যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ভারতের কোচিন বা আহমেদাবাদের মতো শহরের বিমানবন্দরেরও পেছনে পড়ে আছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

মানের সনদে তলানির কাতারে
র‍্যাংকিং তৈরি হয় যাত্রীদের ভোটে। এর বাইরে স্কাইট্র্যাক্স সরেজমিনে সুযোগ-সুবিধা, পরিচ্ছন্নতা, খাবার, কেনাকাটা ও কর্মীদের সেবা যাচাই করে আলাদা মানসনদ দেয়, যা স্টার রেটিং নামে পরিচিত। এই মূল্যায়নে শাহজালাল পেয়েছে ২-স্টার, যা স্কাইট্র্যাক্সের মূল্যায়িত বিমানবন্দরগুলোর নিচের সারির মান। তবে এই কাতারে ঢাকা একা নয়। দেশের চট্টগ্রামের শাহ আমানত, ভারতের চেন্নাই, পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরও ২-স্টার পেয়েছে। বিপরীতে শ্রীলঙ্কার কলম্বো পেয়েছে ৩-স্টার, আর ভারতের মুম্বাই ও ব্যাঙ্গালোর পেয়েছে ৪-স্টার।

স্কাইট্র্যাক্সের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যাত্রীদের আরাম ও সুবিধার দিক থেকে শাহজালাল নিম্নমানের। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এখানকার সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত। কেনাকাটা ও খাবারের দোকানের মান ও বৈচিত্র্য দুর্বল, মুঠোফোন চার্জের ব্যবস্থা কম, বসার আসন অপর্যাপ্ত ও অস্বস্তিকর। পরিচ্ছন্নতার মান বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর নিরাপত্তা তল্লাশি ও ইমিগ্রেশনকে বলেছে ধীর ও আমলাতান্ত্রিক।

স্কাইট্র্যাক্সের যাচাইয়ের তালিকায় আরও ছিল লাগেজ পেতে কত সময় লাগে, ব্যাগেজ হলের অবস্থা, ট্রলি, শৌচাগারের পরিচ্ছন্নতা, ওয়াইফাই, দিকনির্দেশক চিহ্ন, সহায়তা ডেস্ক এবং ভিড় ও সারি সামলানোর ব্যবস্থা।

একই ধরনের সমস্যার কথা উঠে এসেছে দাতা সংস্থার নথিতেও। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাইকা (JICA) ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাহজালালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কারিগরি প্রকল্প চালায়। প্রকল্পের পটভূমিতে সংস্থাটি বলেছে, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

ফলে রপ্তানি-আমদানি টার্মিনালে পণ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ও জমে থাকত। লাগেজ ও পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় ক্ষতি আর হারিয়ে যাওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেবার মান পড়ে যাওয়ার বড় কারণ। প্রকল্পটির সমাপনী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। এটি কোনো যাত্রীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমস্যা-বিবরণী। তবে জাইকা যে হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে, তার সবই চুরি নয়। ভুল গন্তব্যে চলে যাওয়া কিংবা অসাবধান নাড়াচাড়াতেও লাগেজ হারায়।

বিদেশি যাত্রীর চোখে ‘শম্বুকগতির’ বিমানবন্দর
ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ট্রিপঅ্যাডভাইজারে (Tripadvisor) যাত্রীদের পর্যালোচনাতেও এসব সমস্যার ছাপ স্পষ্ট। এসব পর্যালোচনা বৈজ্ঞানিক জরিপ নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তবে একই অভিযোগ বারবার ফিরে এলে তা উপেক্ষা করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের বাসিন্দা মাইকেল এল ফ্লেমিং ২০২৫ সালে লিখেছেন, বিমানবন্দরটি ছোট ও ভিড়ে ঠাসা। তার মতে, এখানে সবকিছু চলে শম্বুকগতিতে। শুল্কমুক্ত কেনাকাটার সুযোগও সামান্য।

আরও পড়ুন

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আরেক যাত্রী লিখেছেন, ইমিগ্রেশনের সারি এগোচ্ছিল খুব ধীরে, লাগেজ পেতে লেগেছে প্রায় দুই ঘণ্টা। যাত্রী সহায়তা বলতে কিছু পাননি, ওয়াইফাই কাজ করেনি, বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সি পেতেও ভোগান্তি। পুরো অভিজ্ঞতাকে তিনি ভয়ংকর ও আতঙ্কজনক বলে বর্ণনা করেছেন।

চলতি বছরের মে মাসে পেদ্রো পাওলো এফ নামের এক যাত্রী পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের সেবা, টার্মিনালে ঢোকার ব্যবস্থা, পার্কিং ও প্রবেশপথ ব্যবস্থাপনার কড়া সমালোচনা করেছেন। ২০২৩ সালে নিউইয়র্কের প্রোফাইলধারী সুহেল নামের একজন ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, কর্মীদের আচরণ ও অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ করেন। আর ২০২১ সালের এক পর্যালোচনায় এক যাত্রী জানান, বিমান থেকে নামার পর ট্রলি না পেয়ে শতাধিক মানুষের সারিতে প্রায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে।

ভারতীয় লেখক স্বপন দাশগুপ্ত ২০২৩ সালে ওপেন ম্যাগাজিনের এক কলামে লেখেন, ঢাকা বিমানবন্দরের সাধারণ যাত্রীদের অংশটি তাঁকে দিল্লির পুরোনো পালাম বিমানবন্দরের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সেখানে ব্যস্ততার সঙ্গে মিশে আছে বিশৃঙ্খলা।

লাগেজ নিয়ে অভিযোগের পাহাড়
সৌদি আরবে ২৭ বছর ধরে অবস্থান করছেন প্রবাসী ইসহাক আলী। এই সময়ের মধ্যে ২৫ বার দেশে যাওয়া আসা করেছেন। প্রায় প্রতিবারই দেশে ফেরার আনন্দ মাটি করেছে বিমানবন্দরে লাগেজ বুঝে পাওয়ার ভোগান্তি আর কর্মীদের আচরণ।

২০২২ সালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) এক গণশুনানিতে এসব কথা বলেন তিনি। অভিযোগ করেন, তার লাগেজ থেকে মূল্যবান জিনিস চুরি হয়েছে, বিষয়টি একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেনও। সেই শুনানিতে আরও অনেক প্রবাসী লাগেজ পেতে দেরি, হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।

অভিযোগ যে কম নয়, তার প্রমাণ মেলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজের হিসাবেই। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি প্রায় দেড় বছরে হটলাইন ও ওয়েবসাইটে ২০ হাজারের বেশি অভিযোগ ও জিজ্ঞাসা জমা পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩০ শতাংশ, হারানো জিনিস খোঁজার শাখা লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সংক্রান্ত। সে হিসাবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজারে।

এই হিসাবে অভিযোগের পাশাপাশি জিজ্ঞাসাও আছে। আছে দেরিতে পৌঁছানো, ভুল গন্তব্যে চলে যাওয়া কিংবা যাত্রীর নিজের ফেলে যাওয়া জিনিসের খোঁজও। কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট অভিযোগ ও জিজ্ঞাসার ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশের সমাধান হয়েছে। তবে এটি সব ধরনের অভিযোগ মিলিয়ে হিসাব, হারানো লাগেজ ফেরত পাওয়ার হার নয়। সমস্যাটি নতুনও নয়। ২০১১ সালে দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিমানবন্দর সূত্রের বরাতে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ জন যাত্রী লাগেজ ছাড়াই বিমানবন্দর ছাড়তেন। শুধু জুন মাসেই আসা লাগেজের মধ্যে ৩ হাজার ৬০০টির বেশির হদিস মেলেনি। হারিয়ে যাওয়া মানেই চুরি নয়, তবে লাগেজ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যে দীর্ঘদিনের, এ তথ্য তা মনে করিয়ে দেয়।

লাগেজ খোলা, কাটা বা ভাঙা অবস্থায় পাওয়ার ঘটনার জন্য কর্তৃপক্ষের আলাদা নির্দেশনাই রয়েছে। বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটের প্রশ্নোত্তর অংশে এবং লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখার নির্দেশনায় বলা আছে, এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস ও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখায় লিখিত অভিযোগ করতে হবে।

বাইরে ওত পেতে থাকে লুটেরা চক্র
মিসর থেকে ফিরে বিমানবন্দর গোলচত্বরের কাছে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন লিটন সরকার। হঠাৎ অস্ত্র ঠেকিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় তার লাগেজ, হাতব্যাগ, সোনার গয়না ও নগদ টাকা। আরেক ঘটনায় যুক্তরাজ্যফেরত ওমর শরীফকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে অপহরণ করে লাগেজ ও পাসপোর্ট লুটের অভিযোগ ওঠে। এ দুটি ঘটনা জানিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (DB)। ২০২১ সালে এমন একটি চক্রকে ধরার পর ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা এক বছরে বিমানবন্দর এলাকায় ৫০ থেকে ৬০টি ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণ করে মালামাল লুটের তথ্য দিয়েছে। অথচ মামলা হয়েছিল মাত্র সাতটি।

কেন এত কম মামলা? পুলিশের ভাষ্য, অনেক প্রবাসী অল্প দিনের ছুটিতে আসেন, দ্রুত ফিরে যান। মামলা ও আইনি ঝামেলায় জড়াতে চান না তারা। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনেও বিমানবন্দর এলাকায় এই চক্রের তৎপরতার বিবরণ উঠে এসেছে। পরের বছর আরও বড় চিত্র সামনে আনে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB)। ২০২২ সালে চারজনকে গ্রেপ্তারের পর র‍্যাব জানায়, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একটি অজ্ঞান পার্টি প্রায় ১৫ বছরে প্রায় ৩০০ জনকে অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই প্রবাসী। কৌশল ছিল সহজ। বিদেশফেরত যাত্রীর সঙ্গে ভাব জমানো, একসঙ্গে গাড়িতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া বা কিছু খেতে দেওয়া। তারপর অচেতন করে টাকা, সোনা ও দামি জিনিস নিয়ে সটকে পড়া। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানে সোনা ও চেতনানাশক মেশানো খাবারও উদ্ধার করা হয়।

পৃথিবী একদিকে, বাংলাদেশ আরেকদিকে
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি’ থাকে, যাদের মূল কাজই হলো যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা ও সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি একই সাথে দেশের রেগুলেটরি (নিয়ন্ত্রক) এবং এয়ারপোর্ট অপারেটর (পরিচালক)—দুটি দ্বৈত ভূমিকা পালন করছে। সিভিল এভিয়েশনের প্রধান কাজ রেগুলেটরি ফাংশন বা তদারকি করা হলেও তারা নিজেরাই বিমানবন্দর পরিচালনা করায় সেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

শাহাজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এপিবিএন, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ প্রায় ২৬টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা কাজ করে। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্থা বা বাহিনী থাকলেও তারা বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কাছে দায়বদ্ধ নয়। ফলে বিমানবন্দরে কোনো অব্যবস্থাপনা বা অনিয়ম দেখা দিলে এয়ারপোর্ট অথরিটির পক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না।

কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও রেগুলেটর এবং অপারেটর আলাদা না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরগুলোর কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের যথাযথ পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং যাত্রীদের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব বা সেবার মানসিকতার বড় অভাব রয়েছে। অন্যদিকে নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশও যদি সিভিল এভিয়েশন ও এয়ারপোর্ট অথরিটিকে দুটি পৃথক ও স্বাধীন সত্তা হিসেবে রূপান্তর না করে, তবে বিমানবন্দরের সেবার মান এবং অবকাঠামোগত জটিলতা চিরকালই থেকেই যাবে।”

থার্ড টার্মিনালেই সমাধান দেখছে কর্তৃপক্ষ
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. রাগীব সামাদের বলেন, “বর্তমানে বিমানবন্দরের যে যাত্রী ধারণক্ষমতা রয়েছে, তা অনেক আগেই অতিক্রম হয়ে গেছে। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ ও সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করার দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে ‘টার্মিনাল-৩’ নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এই নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম বা পরিচালনা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন আর অভিযোগগুলো থাকবে না।”

তিনি বলেন, “২০২৩ সালে হযরত শাহাজালাল বিমানবন্দর ১ কোটি ২৭ লাখেরও বেশি যাত্রীকে সেবা দিয়েছে, যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। এত অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে গিয়ে বিদ্যমান জনবল ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বর্তমান কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট হিমশিম খেতে হচ্ছে।”

মালামাল হারানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো বিমানবন্দরের সমস্যা নয়; বরং বিশ্বের প্রায় সব বিমানবন্দরেই ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ সেকশন থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে অনেক সময় নির্দিষ্ট ফ্লাইটে যাত্রীদের ব্যাগ পৌঁছায় না। পরবর্তীতে সেগুলোকে ট্র্যাক করে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া। অনেক সময় অরিজিন যাত্রা শুরুর স্থান থেকেই সিকিউরিটি রেস্ট্রিক্টেড আইটেম (যেমন পাওয়ার ব্যাংক) থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তা ব্যাগ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া কাস্টমস স্ক্যানিংয়ের সময় শুল্কযুক্ত পণ্য যাত্রীর সামনেই তল্লাশি করে বের করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো করা হলেও অনেক সময় যাত্রীরা মনে করেন তাদের ব্যাগ কেটে জিনিসপত্র চুরি বা নষ্ট করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রবাসীদের বহন করা কাগজের কার্টুনগুলো খুব বেশি শক্তিশালী বা টেকসই হয় না। বিমানের কার্গো বা কন্টেইনারে লোডিংয়ের সময় ওপরের অন্যান্য ব্যাগেজের চাপে এই কার্টুনগুলো প্রায়ই ফেটে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যাত্রীরা তাদের ব্যাগ বা মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পান, যা নিয়ে অনেক সময় অনভিপ্রেত ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।”

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button