সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ছে ১৪২% পর্যন্ত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বড় অঙ্কে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোতে প্রথম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০% পর্যন্ত বাড়বে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়বে ১৪২% পর্যন্ত। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ভাতার পরিমাণও বাড়বে। মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।
সরকার মনে করে, নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্ম-উদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। এ বিষয়ে আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন। এতদিন ৫ম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে ইমেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
একইসঙ্গে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন ১০০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।
নতুন বেতন স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা ও পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক এক লাখ ৫,৫৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বেতন স্কেলে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগের অবসর গ্রহণকারীদের তথ্য না থাকায় ওআরওপি একবারে বাস্তবায়ন না করে ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিবর্তে বর্তমানে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন স্ল্যাবভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মাসিক ৯,০০০ টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০% বাড়বে। ৯,০০১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫%, ২০ হাজার এক টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫%, ৩০ হাজার এক টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০% এবং ৪০ হাজার এক টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন ৫৫% বাড়বে। এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে।
এদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, নতুন বেতন কাঠামোতে অর্থনীতিতে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে এ বছর এর ৩০% বাস্তবায়িত হবে, এটি একবারে পুরোপুরি করা উচিত ছিল।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের মানুষ চাপে পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত ১০-১১ বছরে বেতন বাড়েনি, অথচ জিনিসপত্রের দাম লাগাতার বেড়েছে। পাশাপাশি এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তাদের ভোগ বা খরচ বাড়বে, যার ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। নতুন এই বেতন কাঠামো স্বস্তিদায়ক হলেও এর জন্য অর্থের জোগান দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।
source: Daily Amar Desh