Uncategorized
ঢাবিতে ৩ শিক্ষার্থীকে মারধর-ছিনতাই, ছাত্রদলের ৮ কর্মীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন সাবেক শিক্ষার্থীকে মারধর, মোটরসাইকেল আটকে রাখা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের ৮ কর্মীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ‘বহিরাগত’ সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের নামে করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আব্দুর রহিম সাজিদ শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তার অভিযোগ, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও তাদের ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে দুই দফায় মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি দৌড়ে শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৬ জুলাই রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চত্বর, মল চত্বর ও শাহবাগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এর আগে গত ১৪ মে তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্তরা অধিকাংশ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হামলার পর ভুক্তভোগীদের সরেজমিনে প্রাপ্ত চিত্র © সূত্র ভুক্তভোগী তিনজন হলেন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ফারদিন খান, আব্দুর রহিম সাজিদ ও মোর্শেদ আহমেদ। তারা তিনজনই ২০২৩ সালে এসএসসি পাস করেন। সাজিদ একই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেছেন। ফারদিন বর্তমানে অন্য একটি কলেজ থেকে দ্বিতীয়বার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। আর মোর্শেদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাজিদের জিহ্বা, চোখ, ঘাড় ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ফারদিনের চোখ, নাক, কান, ঠোঁটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। মোর্শেদের হাত ও পিঠেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনার পর তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের বিজয় একাত্তর হলের ইংলিশ ফর স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজ (ইএসওএল) বিভাগের আল শামস, জিয়াউর রহমান হলের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সাদমান সাকিব, সূর্যসেন হলের মাশরুর কামাল মাহি ও শিব্বির আহমেদ। এ ছাড়া ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অভি রহমান, একই হলের সাইফুর রসুল পলাশ, ফারসি ভাষা বিভাগের তামজিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের হীরা রহমানের নামও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত ১৪ মে’র ঘটনায় আল শামস, মাশরুর কামাল মাহি ও শিব্বির আহমেদসহ একই দলের আরও কয়েকজন জড়িত ছিলেন। অভিযোগপত্রে নাম না থাকলেও ছবি দেখে তারা ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিহাব, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সানিয়াত শুভ ও অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অমিত হাসান অমিকেও হামলায় জড়িত হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
ছাত্রদলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আল শামস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খানের অনুসারী। অভি রহমান ও হীরা রহমান ছাত্রদল নেতা আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাদমান সাকিব সূর্যসেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্তের সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।
ওই নেতা আরও বলেন, তামজিদ ও শিব্বির ছাত্রদল নেতা তানভীর আল হাদী মায়েদের, সাইফুর রসুল পলাশ ও মাশরুর কামাল মাহি তানভীর বারী হামিমের এবং অমিত হাসান অমি ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খানের অনুসারী বলে জানা গেছে।
(বাঁয়ে)সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সাইফ খানকে নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ আশ শামসের , (ডানে) দলীয় প্রোগ্রামে সাইফ খানের সাথে শামস © সূত্র ভুক্তভোগী ফারদিন বলেন, গত ১৪ মে তিনি ও সাজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। এ সময় আল শামসের নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের ‘বহিরাগত’ সন্দেহে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
ফারদিনের অভিযোগ, তার মোটরসাইকেলে হলার না থাকলেও হলার বাজানোর অভিযোগ তুলে তার মানিব্যাগ ও মোটরসাইকেল নিয়ে নেওয়া হয়। মোটরসাইকেলটি ২০ থেকে ২৫ মিনিট আটকে রাখা হয়। এ সময় মানিব্যাগ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়। তাকে কয়েকটি থাপ্পড়ও মারা হয়। সাজিদ এর প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হন। পরে ফারদিনের বন্ধুদের কয়েকজন সিনিয়র এসে বিষয়টি মীমাংসা করেন।
ফারদিন বলেন, গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু মোর্শেদ ঢাকায় এলে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের আট বন্ধু উপাচার্য চত্বরে জড়ো হন। এ সময় আল শামসের নেতৃত্বে কয়েকজন এসে আগের ঘটনা নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলের চাবি চাওয়া হয়।
চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে সাত-আটটি থাপ্পড় মারা হয় বলে অভিযোগ করেন ফারদিন। পরে তার মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়া হয়। সানিয়াত শুভ মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান বলে ফারদিনের দাবি। এ ঘটনার একটি ভিডিও রয়েছে বলেও তিনি জানান।
ঢাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের সাথে অভিযুক্ত হীরা রহমান © সূত্র এরপর অভিযুক্তরা সাজিদকে ফোন করে ডেকে আনেন। ফারদিনের মোটরসাইকেলটি বিজয় একাত্তর হলে প্রায় আধা ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। সাজিদ সেখানে এলে তাকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনের নির্জন স্থানে নিয়ে থাপ্পড়, ঘুষি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় সাজিদ দৌড়ে শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন। জগন্নাথ হলের এক সিনিয়রকে ফোন করলে তিনি থানায় আসেন। পুলিশের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা হয় বলে জানা গেছে।
ফারদিন জানান, ছাত্রশক্তির নেতা হাসিব আল ইসলামের উদ্যোগে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছিল। এ সময় আল শামস ও তার সহযোগীরা হাসিব ও ছাত্রদল নেতাদের সামনে তাকে আবার মারধর করেন। তাকে সাজিদকে ডেকে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ফারদিনের কান ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। পরে হাসিব তাকে রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠান। সাজিদ বলেন, ফারদিনের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে ফিরে এলে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন তাকে লাথি ও ঘুষি মারেন। ধাওয়া করে মারধরের পর এক ব্যক্তি তাকে রিকশায় তুলে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
তানভীর আল হাদী মায়েদ ও ছাত্রদল সাধারন সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের সাথে অভিযুক্ত শিব্বির আহমেদ © সূত্র ঘটনার পরদিন শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দেন সাজিদ। অভিযোগে তিনি বলেন, আল শামসের নেতৃত্বে ফারদিনকে মারধর করা হয়। তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ধস্তাধস্তির সময় তার ডান চোখে আঘাত লাগে। টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। পরে তিনি পালিয়ে থানায় আশ্রয় নেন।
আল শামস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অধিকাংশ অভিযোগ সঠিক নয়। রহিম আগে কয়েকজনের গায়ে হাত তুলেছিলেন। পরে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। মীমাংসার পর ছাত্রশক্তির পক্ষ থেকে তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রহিমকে উদ্যানে নিয়ে মারধর বা অপহরণের চেষ্টা করা হয়নি। শুধু কথা বলা হয়েছিল। থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে, কারও টাকা বা মোবাইল নেওয়া হয়নি।
সানিয়াত শুভ মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। হীরা রহমান ও অভি রহমানও মারধরের ঘটনায় উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খান রাঙামাটি থেকে ফিরে বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।
ঢাবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের সাথে অভিযুক্ত অভি © সূত্র এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, কোনো শিক্ষার্থী মোরাল পুলিশিং বা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দ্যা ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য নিরাপদ স্থান হতে হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
source: The Dhaka Diary