Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
Uncategorized

সাংবাদিকতায় ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ ও ‘ইমেরিটাস এডিটর’ পদ নিয়ে প্রশ্ন, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা? 

সিনিয়র সাংবাদিকের প্রতীকী ছবি© আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নির্মিত

দেশে বর্তমানে ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ পরিভাষাটি অনলাইন ও অফলাইনে বেশ আলোচনায় রয়েছে। এ পরিচয়ে বিভিন্ন সময়ে কা্উকে কাউকে টেলিভিশন টকশোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থাণকে অবমাননা এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বয়ান প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে। এ কারণে, প্রায় সময়ই সিনিয়র সাংবাদিক পরিচয়ধারীদের এমন ভূমিকা নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধও হচ্ছে এই ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ পরিভাষাটিই। 

শুধু তাই নয়, এ পদ বা উপাধিটি বর্তমানে মানুষের কাছে যেন এক প্রকার ‘তিরস্কারে’ রূপ নিয়েছে। যার দরুন, দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করা সাংবাদিকরা এখন আর এ পরিচয় বহন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না বলে দেখা যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে যে, আসলে এই ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ বলতে কোনো পরিভাষা সাংবাদিকতা অধ্যয়নে কিংবা এ পেশায় অন্তর্ভুক্ত আছে কিনা, বা কতদিন এ পেশায় থাকলে সিনিয়র সাংবাদিক হওয়া যায় কিংবা কাকে কারা এ পদ বা উপাধিতে ভূষিত করতে পারে? তাছাড়াও, আওয়ামী লীগের আমলে দেশে ‘ইমেরিটাস এডিটর’  নামে আরেকটি পদের প্রচলনও ছিল, সেটির ব্যাপারেও মানুষের মাঝে বিভিন্ন সময়ে কৌতূহল দেখা গেছে। এই দুটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অভিমত জানার চেষ্টা করেছে দ্য ঢাকা ডায়েরি। 

বিশেষজ্ঞদের মাঝে বিষয় দুটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও যুক্তি রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ পদবি সাংবাদিকতায় কোনো সাংগঠনিক কিংবা আইনগত পদ নয়। তবে এ পেশায় দক্ষতা, যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব অথবা সামগ্রিক অবদানের ভিত্তিতে ব্যক্তিকে ‘সিনিয়র সাংবাদিক বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। এদিকে, এটি একটি বিস্তৃত শব্দ হওয়ার কারণে কেউ কেউ এই পদবি ব্যবহারের পরিবর্তে সমাজ, দেশ ও রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণে অংশ নেওয়া অভিজ্ঞ সাংবাদিকদেরকে ‘ফ্রিল্যান্সার জার্নালিস্ট’, ‘ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক’, ‘পলিটিক্যাল কমেন্টেটর’, ‘রাজনৈতিক ভাষ্যকার’ কিংবা ‘সোশ্যাল ন্যারেটরের’ মতো সম্মানজনক পদবি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে, ‘ইমেরিটাস এডিটর’ নামের পদটিতে অনারারি হিসেবে গণমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যোগ্য ব্যক্তিকে স্থান দেওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারো কারো মতে, ‘ইমেরিটাস এডিটর’ নিয়োগের প্রচলন বহির্বিশ্বেও রয়েছে, যদিও কেউ কেউ আবার এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

সিনিয়র সাংবাদিকতার অস্তিত্ব ও ব্যবহারের বিষয়ে অভিমত জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, “প্রতিষ্ঠানভেদে ‘সিনিয়র রিপোর্টার’, ‘সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট’, ‘সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর’ ইত্যাদিসহ আনুষ্ঠানিক পদ আছে বা থাকতে পারে। কিন্তু ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ একটি বিস্তৃত পরিচয়, কোনো নির্দিষ্ট সাংগঠনিক পদ নয়। তাই শব্দটি ব্যবহারে সতর্কতা থাকা উচিত; কেবল বয়স বা কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য নয়, পেশাগত যোগ্যতা ও অবদানই এর প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত।”

ঢাবির এ অধ্যাপক আরও বলছেন, “সাংবাদিকতায় ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ নামে কোনো সর্বজনস্বীকৃত বা আইনগত পদ নেই। এটি মূলত একজন সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ কর্মজীবন, পেশাগত দক্ষতা, অবদান ও গ্রহণযোগ্যতাকে বোঝাতে ব্যবহৃত একটি সম্মানসূচক বা বর্ণনামূলক পরিভাষা। কোনো ব্যক্তি কেবল নির্দিষ্ট বছর চাকরি করলেই সিনিয়র সাংবাদিক হয়ে যান না; বরং তার অনুসন্ধানী কাজ, পেশাগত সততা, সম্পাদকীয় বিচক্ষণতা, সহকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংবাদিকতায় সামগ্রিক অবদানের ভিত্তিতে তাকে ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’ 

ইমেরিটাস এডিটরের বিষয়ে অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলছেন, “এটা এক ধরনের অনারারি বা সাম্মানিক পদ; অবসরে চলে যাওয়ার পরে কোনো খ্যাতিমান সাংবাদিককে এই পদে বসিয়ে সম্মান জানানো যায়। তার কাজ প্রতিদিনকার সংবাদ বা লেখালেখি কিংবা সংবাদপত্র অফিস ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত নয়। তিনি অনেকটা সংবাদপত্র অফিসে মর্যাদা বা অলংকারের প্রতীক। তার ভূমিকা হতে সমাজে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের দিকে নজর দেওয়া, দৈনন্দিন নয় বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসরে সাংবাদিকতাকে স্থাপন করা; সাংবাদিকতা পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা করা। নীতি নৈতিকতার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া। গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ পলিসি নির্মাণে ভূমিকা রাখা। অনেকটা ‘মিডিয়া ন্যায়পালের’ ভূমিকা তিনি রাখতে পারেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও উপস্থাপক মো. মিনহাজ উদ্দীন দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, “সিনিয়র সাংবাদিক বা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এই পদটা এখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বিভিন্ন পত্রিকার টকশোগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেখানে এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকগণ নানা বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা অনেক চাঁচাছোলা এবং কঠোর মন্তব্য করছেন। যেগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই অনেকেই প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন যে, তাদেরকে আসলে সিনিয়র সাংবাদিক বা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলা যায় কিনা? বিষয়টি একটু সংবেদনশীল। উদাহরণস্বরূপ, যারা আসলে বিচারপতি হন, আইন-আদালতে কাজ করেন, তাদেরকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলা হয়, খুব সম্ভবত সাবেক বিচারপতি বলা হয় না। যারা শিক্ষকতা করেন, অধ্যাপনা করেন, অধ্যাপনা শেষে তাদেরকে সাবেক অধ্যাপক বা সাবেক শিক্ষক বলা হয়? না। হয়ত বলা হয় অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বা শিক্ষক। এটাই আমাদের চল; এভাবে আমরা ব্যবহার করি।”

প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যারা আগে সাংবাদিকতা করেছেন, বড় দায়িত্বে ছিলেন, তাদেরকে কী বলবেন? তাদেরকে সাবেক সাংবাদিক যদি বলেন, তারা এটা মানতে চান না, তারা বলতে চান, ‌‌‘আমরা এখনও সাংবাদিকতা করি’। তাদেরকে আর কী বলতে পারেন? অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক? খুব সম্ভবত সেই পদবিতেও তারা খুব একটা খুশি নন। যদি বলেন চাকরিবিহীন সাংবাদিক? এটার মধ্যে এক ধরনের অপমান বা নেতিবাচকতা আছে, সেটাও তারা মানতে রাজি নন। সেজন্যই হয়ত অনেকেই সিনিয়র সাংবাদিক বা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পদবিটা মেনে নিয়েছেন বা ব্যবহার করেন। আমার কাছে মনে হয়, এর সাথে একটা ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে, যেটা আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গ্রহণযোগ্য। সেটাকে বলা হয় হচ্ছে, ‘ফ্রিল্যান্সার জার্নালিস্ট’। যাকে আমরা বলতে পারি, ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক। কারণ, যারা সাংবাদিকতা করেছেন একসময় বা দীর্ঘদিন, যারা এখন টকশোতে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেন, তারা সাংবাদিকতার একটা অংশের সঙ্গে যুক্ত। তারা বিভিন্ন জায়গায় নিবন্ধ লেখেন, মতামত দেন। সে ক্ষেত্রে এই জায়গায় যথাযথ পদবি হতে পারে ‘ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক’। এটা কেউ গ্রহণ করবে কিনা আমি জানি না, তবে অ্যাকাডেমিক্যালি এটা হতে পারে।”

সিনিয়র সাংবাদিক পদবির বিকল্প উল্লেখ করে জবির এ শিক্ষক বলেন, “আমি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম ফলো করি। সেসকল গণমাধ্যমে যারা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন এবং সমাজের বিভিন্ন বিষয়কে ব্যাখ্যা করেন, তাদেরকে দুটো ভিন্ন নামে ডাকা হয়। সে অনুযায়ী, বাংলাদেশের যারা এখন সিনিয়র সাংবাদিক পরিচয়ে রাজনৈতিক বিষয়ে বিশ্লেষণ করেন, আন্তর্জাতিকভাবে তাদের একটা নাম আছে, যেটিকে আপনার বলা হয় ‘পলিটিক্যাল কমেন্টেটর’ বা ‘রাজনৈতিক ভাষ্যকার’। তারা এই ‘রাজনৈতিক ভাষ্যকার’ পদবিটা তারা গ্রহণ করতে পারেন। এটা খুব ভালো ও সম্মানজনক পদবি। দ্বিতীয়ত, তারা তো শুধুমাত্র রাজনীতি নিয়েই কথা বলেন না, সমাজের বিভিন্ন বিষয়ের সংগতি-অসংগতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেন এবং নিঃসন্দেহে সে সকল মতামত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব মতামতের প্রভাব আছে আমাদের সমাজে। এই প্রেক্ষাপটে তাদেরকে আরেকটা নামে ডাকা যেতে পারে, সেটাও খুব সম্মানজনক। সেটাকে বলা হয় হচ্ছে ‘সোশ্যাল ন্যারেটর’ বা ‘সামাজিক ভাষ্যকার’।”

সিনিয়র সাংবাদিক পরিভাষা নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে মিনহাজ উদ্দীন বলেন, “বাংলাদেশে টেলিভিশনগুলোতে স্বল্প খরচে এক বা দুই ঘণ্টার যে প্রোডাকশন তৈরি করা যায়, সেটা হচ্ছে টকশো। একটা টকশোতে তিনজন অতিথিকে ডেকে খুব স্বল্প পরিমাণ সম্মানী দিয়ে খুব সহজেই কন্টেন্ট তৈরি যায়। এক্ষেত্রে তারা আসলে কাদেরকে চুজ করছেন? এমন কিছু ভয়েস, যারা সাহসী, যারা আগে সাংবাদিক ছিলেন বা এ সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ব্যক্তিরা এই সব জায়গায় আসতে পারেন এবং মতামত দিতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, এই মতামতগুলো তারা যখন তারা দিচ্ছেন, সেগুলো নিয়ে নানা ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, বিতর্কও তৈরি হচ্ছে। তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ‘আচ্ছা, উনি কোথাকার সাংবাদিক? কোথায় সাংবাদিকতা করেছেন?’ এই প্রশ্নটা তোলাকেও আমি অযৌক্তিক মনে করি না, যে কেউই তুলতে পারে। এই প্রশ্ন থেকে বাঁচার জন্য আসলে তার পরিচয়টা সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার, ফ্রিল্যান্সার জার্নালিস্ট, ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক কিংবা সোশ্যাল ন্যারেটরের মতো সম্মানজনক পদগুলো তারা ব্যবহার করতে পারেন।”

তিনি বলছেন, “কারও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার যে কারও আছে। যে কেউ বলতে পারে যে, ‘আপনি কোথাকার সিনিয়র সাংবাদিক?’ এই প্রশ্নটাও যেমন হতে পারে, আবার এটাও ঠিক, যিনি সাংবাদিক তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা এবং তাকে আপনার অপদস্থ করার জন্য এই টার্মটা, মানে সিনিয়র সাংবাদিককে একেবারেই মুছে ফেলতে হবে, এটাকে অবজ্ঞা করতে হবে, সেটাও আমি যথাযথ বলে মনে করি না। তবে যদি কোনো সিনিয়র সাংবাদিক পদধারীর কারো কোনো মন্তব্য, কথা, ব্যাখ্যা যদি আপনি অপছন্দ করেন, তাহলে উচিত হবে তাকে আপনার বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই জবাব দেওয়া।”

ইমেরিটাস এডিটরের বিষয়ে মিনহাজ উদ্দীন বলেন, “ইমেরিটাস প্রফেসরের নামে একটি পদ বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আছে। আমি যতদূর জানি, যখন একজন অধ্যাপক তার পুরো কর্মজীবন শেষ করেন, তখন তার কর্মজীবনের সঞ্চিত জ্ঞান বা প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করার জন্য একটা সম্মানজনক পদ তৈরি করে তাকে অ্যাকাডেমিক কাজে যুক্ত রাখার প্রক্রিয়াকে ইমেরিটাস প্রফেসর বলা হয়। অন্যদিকে, ইমেরিটাস এডিটর পদবিটা বাংলাদেশে খুব বেশি প্রচলিত নয়। মনে হয়, এটি প্রথমবার প্রচলন করেছিলেন জনাব নাইমুল ইসলাম খান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন। তখনও এটা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল। তবে আমার মতে, ইমেরিটাস এডিটর আসলে কেউ না কেউ হতেই পারেন। আমার ধারণা, এটা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার ডেকোরামে এই পদের প্রচলন আছে, তাতে আমি কোনো আপত্তি দেখি না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, যখন ইমেরিটাস এডিটর হয়ে কেউ অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করেন, একচোখা দৃষ্টিতে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে এই পদ নিয়ে সমাজের ভালো-মন্দ দেখার বদলে শুধুমাত্র কোনো একটি পক্ষকে সাপোর্ট করেন, তখন আসলে ওই পদের মাহাত্ম্য বা আবেদন অনেক কমে যায় এবং একটা নেতিবাচক অর্থ তৈরি করে। তাছাড়াও, এ পদটির জন্য যে দক্ষতা, যোগ্যতা এবং দায়িত্ব থাকা প্রয়োজন, সেগুলো অবশ্যই ব্যক্তির মধ্যে থাকতে হবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহাম্মদ দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, “যারা সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করছেন, তাদেরকে পরিচয়ের স্বার্থে হয়ত অনেক সময় সিনিয়র সাংবাদিক বলার চর্চা আছে। যেমন: যারা কেবল এ পেশার মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেছে, তাদের ব্যাপারে কারো কাছে বলার সময় হয়ত তাদেরকে হয়ত জুনিয়র, নবীন কিংবা তরুণ সাংবাদিক বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সাংবাদিকতা অধ্যয়নে ‘সিনিয়র বা জুনিয়র সাংবাদিক’ নামে এমন প্রতিষ্ঠিত ও নির্দিষ্ট পদ নেই। এগুলো আসলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তৈরি। এ পেশায় যারা আছে, তারা সবাই সাংবাদিক; এটার অর্থ ব্যাপক। তবে, এর ভেতরে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক সৃষ্ট কিছু পদ রয়েছে। যেমন: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বা সিনিয়র রিপোর্টার। এগুলো আলাদা বিষয়। এর বাইরে, লোকজন এই সিনিয়র সাংবাদিক ব্যবহার করে হয়ত নিজেকে জাহির করতে একটু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এটা একটি স্বাভাবিক বিষয় থাকলেও যার তার নামের আগে সিনিয়র সাংবাদিক বসানোর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করাই ভালো। ”

‘ইমেরিটাস এডিটর’ পদের ব্যাপারে অধ্যাপক মনসুর আহাম্মদ বলেন, “‘ইমেরিটাস এডিটর’ পদটার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সময়ে শুনেছিলাম। এটি আমাদের নতুন সময়ের সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান সুবিধা পাওয়ার জন্য, নিজেকে বোস্ট আপ কিংবা হাইলাইট করার জন্য নিজেই প্রচলন করেছিলেন। এটা সেল্ফ ক্রিয়েশন। দুনিয়ার কোথাও এমনটা দেখা যায় না। স্ট্যান্ডার্ড কোনো মিডিয়া হাউজও এটা ব্যবহার করে না।”

প্রসঙ্গত, ইয়াক ট্যাক নামে এক অভিধান অনুসারে, “সিনিয়র সাংবাদিক তিনিই, যিনি একজন পেশাদার লেখক বা সংবাদকর্মী, যার সাংবাদিকতায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও উচ্চ দক্ষতা রয়েছে এবং যিনি প্রায়ই কোনো সংবাদমাধ্যমে নেতৃত্বদানকারী বা তত্ত্বাবধায়ক (সুপারভাইজারি) দায়িত্ব পালন করেন।”

এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের কোনো গ্যাজেট বা আইনে সিনিয়র সাংবাদিকের কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায়নি। এমনকি দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এও এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ভারতে গোয়া প্রদেশ সরকারের করা ২০১৩ সালের এক গেজেটে এ সংক্রান্ত একটি সংজ্ঞা পাওয়া গেছে। সেখানে বলা আছে: “সিনিয়র সাংবাদিক” বলতে এমন একজন সাংবাদিককে বোঝায়, যিনি ন্যূনতম আট বছর ধারাবাহিকভাবে পূর্ণকালীন সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন; অথবা এমন একজন সাংবাদিক, যিনি কমপক্ষে আট বছর পূর্ণকালীন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন, অন্য কোনো পেশা বা কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত নন, সংবাদপত্র বা সংবাদ সংস্থায় সাংবাদিকতা পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং এই প্রকল্পের অধীন গঠিত বাছাই কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত।”

অন্যদিকে, বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যম দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের ইমেরিটাস এডিটর ছিলেন মোঃ নাঈমুল ইসলাম খান। কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে ইমেরিটাস এডিটরের ধারণা ও এটির চর্চা তার হাত ধরেই হয়েছিল। তিনি ২০২৪ সালের ২৮ মে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। 

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button