Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
ফ্যাক্ট চেক

জুলাই অভ্যুত্থানে আহত তন্বির ছবি নিয়ে অনলাইনে অপপ্রচার চালাচ্ছে আ.লীগ

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই নিজ ক্যাম্পাসে রক্তাক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বি। ছাত্রলীগের নৃশংস হামলায় তাঁর ডান চোখের নিচে ইটের আঘাতে মুখ রক্তাক্ত হয় এবং পরবর্তীতে চোখের নিচে সেলাই করতে হয়। সেসময় তার রক্তাক্ত মুখের ছবি গণ-অভ্যুত্থানের একটি আইকনিক ছবিতে রুপান্তরিত হয়। 

তবে এই ঐতিহাসিক ছবি এবং তন্বির আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও পেইজ থেকে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। 

মুখে ‘টমেটো সস’ মাখার অসত্য দাবি

ফেসবুকে তন্বির আহত হওয়ার ছবিটি পোস্ট করে আওয়ামীলীগপন্থী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও পেইজ থেকে তন্বির মুখের রক্তকে “টমেটো সস” হিসেবে দাবি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, তন্বি নাকি বলেছেন, “আন্দোলন চাঙ্গা করতে হলের বড় ভাইয়ের পরামর্শে মুখে টমেটো সস মেখেছিলাম।”

গত ১৬ জুলাই ভোরের পাতা পত্রিকার নাম ব্যবহার করে তৈরি ‘দৈনিক ভোরের পাতা’ নামক একটি আওয়ামী প্রোপাগান্ডা পেইজে তন্বির নামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, “আন্দোলন চাঙ্গা করতে মুখে টমেটো সস মেখেছিলাম:জুলাই যোদ্ধা সানজিদা তন্বীর স্বীকারোক্তি!”

১৬ জুলাই আওয়ামীলীগপন্থী এক্টিভিস্ট কাজী মামুন তন্বির ভুয়া মন্তব্য সম্বলিত ফটোকার্ডটি শেয়ার করে লিখেছেন, “এইটারে মার্ক করার পরে কত সুশীল তখন আমারে ভুগোল বুঝাইলো!”

১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সাবেক ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এই ছবিটি নিয়ে এখন নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ওই ছাত্রী একজন সিনিয়রের পরামর্শে মুখে টমেটো সস লাগিয়েছিলেন।”

এরকম দাবি সম্বলিত আরো পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্টদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষকও এই ভুয়া উক্তিটি শেয়ার করেছেন। 

১৬ জুলাই নিজের ফেসবুক পেইজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক কাবেরী গায়েন লিখেছেন, “বাহ! আরেকটা অত্যন্ত আইকনিক ছবি ছিল এক মেয়ে হাতে লাঠি যার সারা মুখে ছিল রক্ত। আজ তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন দেখলাম যে বড়ভাইয়ের কথায় তিনি মুখে টম্যাটো সস মেখেছিলেন। এও কি সত্যি? “

এছাড়াও  ‘দৈনিক ভোরের পাতা’ নামক পেইজের ভুয়া উক্তি সম্বলিত ফটোকার্ডটি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির সিনিয়র অধ্যাপক ড. রিসালা তাসিন খান। 

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, উক্তিটি ভুয়া। তন্বি এমন কোন মন্তব্য করেননি। 

ফটোকার্ডটি যে পেইজ থেকে ছড়ানো হয়েছে সেটি মূল ‘ভোরের পাতা’ নামক পত্রিকার ফেসবুক পেইজ নয়। এই পেইজে তৈরির সময় নাম ছিল- ‘সচেতন নাগরিক’। পরে ৪ দফা নাম পরিবর্তন করে ‘Zaima Rahman Friends Club’ করা হয় ২০২৩ সালে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ’দৈনিক ভোরের পাতা’ নামে নামকরণ করা হয়। 

এছাড়াও অনলাইনে সার্চ করে আওয়ামীপন্থী কিছু এক্টিভিস্টের প্রোফাইল ও পেইজ ছাড়া কোন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে তন্বির এমন উক্তি করেছেন এরকম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তন্বির যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছিলো সেটি তুলেছিলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র ফটোসাংবাদিক রোহিত আলী রাজিব। তিনি ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ছবিটির ব্যাপারে বলেন,  “আমরা কয়েকজন সহকর্মী ছবি তুলছিলাম। মেয়েটা এখান দিয়ে যাচ্ছিল, ওর চোখের সামনে দিয়ে রক্ত ঝরছিল, আর হাতে একটা লাঠি ছিল। লাঠি, কারণ ওর ভেতর একটা ভয় কাজ করছিল। তো আমি ছবিটা তুললাম। তখন তো সবারই রক্ত ঝরছিল, কমবেশি সবারই—কারো মাথায়, কারো চোখের নিচে, কারো হাতে, কারো পায়ে।” 

২০২৫ সালের ২৬ জুলাই বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেয়া এক সাক্ষাতকারে তন্বি সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে বলেন, “ভিসি চত্বরের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বাস স্ট্যান্ড করে রাখা ছিল। ছাত্রলীগের হামলা থেকে বাঁচতে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ বাসের ভেতরে, কেউ নিচে, কেউ বাসের আড়ালে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ছাত্রলীগ আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। ওই জায়গা থেকে আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে পিটিয়ে বের করে ছাত্রলীগ। আমি বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম, তখন কয়েকজন আমাকে লাঠি দিয়ে বেদড়ক পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে একটা ইটের টুকরো আমার চোখের নিচে এসে লাগে। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে।”

তিনি আরো বলেন, “হাসপাতালে আসার পর আমি কিছুই বুঝতেছিলাম না। হাসপাতালে একের পর এক আহতরা আসছিল। আমার তিন বান্ধবী স্বর্ণ, তন্নি আর সুপ্রীতি আমাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌঁড়ঝাঁপ করে। তখনো আমার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছিল না। আমাকে অপরাশেন থিয়েটার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার চেয়ে গুরুতর রোগী আরো অনেকে ছিল। তাই অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে আমার সেলাই শুরু হয়। ছয়টি সেলাই লেগেছে ক্ষতস্থানে। চোখের ঠিক নিচে আক্রান্ত হওয়ায় জায়গাটা একটু সেন্সিটিভ ছিল। হাসপাতালে থাকতেই শুনতে পাই, ছাত্রলীগ হাসপাতালেও হামলা করতে আসছে। পরে তড়িঘড়ি করে পলাশীতে আমার বান্ধবীর বাসায় যাই।”

এই বিষয়ে জানতে তন্বির সাথে যোগাযোগ করা হলে  তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “এটা তো আওয়ামী লীগের পুরান একটা প্রোপাগান্ডা। ২৪ থেকেই বলে আসছে (এটা)।”

ডান চোখে আঘাতের ছবিকে বাম চোখে আঘাত বলে অসত্য দাবি

ফেসবুকে আওয়ামীপন্থী ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেইজ থেকে আরো দাবি করা হচ্ছে, তন্বির এক ছবিতে ডান চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেলেও সেলফি ছবিতে তা বাম চোখে দেখা যাচ্ছে।

১৭ জুলাই কাজী মামুন নামে একজন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এখন আবার নতুন নাটক নিয়ে আসছে- মাইর খাইছে চশমা ভাঙছে ডান চোখে কিন্তু সেলাই করছে বাম চোখে। দেখো লো আই কিউ লোকজন দেখো।”

১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সাবেক ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “নতুন ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে তার বাম চোখের নিচে গভীর সেলাইয়ের দাগ, অথচ ঘটনার সময় প্রচারিত ছবিতে রক্তাক্ত অংশটি ছিল ডান চোখের নিচে। বিষয়টি নিয়ে তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। এছাড়া, যদি সত্যিই এত গুরুতর আঘাত ও সেলাই হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণভাবে এমন দাগ ১০/১৫ বছর থাকার কথা। কিন্তু তার প্রোফাইলে থাকা সাম্প্রতিক ছবিগুলোতে চোখের নিচে তেমন কোনো দৃশ্যমান দাগ দেখা যায় না।” 

১৮ জুলাই শুভ কামাল নামে একজন তন্বির আহত হওয়ার ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “গালের ডান দিকের কাটা দাগ বাম দিকে চলে গেছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ইজ রিয়েল!”

এরকম দাবি সম্বলিত আরো পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এটি কোনো ডিজিটাল কারসাজি বা এডিটিং নয়, বরং স্মার্টফোনের ক্যামেরার একটি অতি সাধারণ প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য যাকে মিরর ইফেক্ট বা ইমেজ ফ্লিপিং বলা হয়। 

যখন সেলফি ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা হয় তখন স্ক্রিনে নিজেকে আয়নার মতো উল্টো প্রতিফলনে দেখা যায়। অনেক ফোনে এই উল্টানো ভিউটিই হুবহু গ্যালারিতে সেভ হয়ে যায়। মিরর ইফেক্টের একটি ভিডিও দেখুন এখানে। তন্বির যে ছবিতে আঘাতটি বাম চোখে দেখা যাচ্ছে, সেটি ছিল তাঁর নিজের তোলা একটি “মিররড” সেলফি। অপরদিকে, অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা বা পেছনের মূল ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবিতে তাঁর বাস্তব অবস্থাটি ফুটে উঠেছে, যা নিশ্চিত করে যে আঘাতটি মূলত তাঁর ডান চোখেই লেগেছিল। 

গত ১৭ জুলাই তন্বির ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা তার আহত হওয়ার ছবিগুলো দেখুন এখানে

এছাড়াও ·আহত হওয়ার ১ মাস পর ২০২৪ এর ১৪ আগস্ট “ছাত্রলীগের হামলার শিকার তন্বি কেমন আছেন?” শিরোনামে  বিডিনিউজে প্রকাশিত একটি সাক্ষাতকারেও তন্বির ডান চোখে আঘাতের দাগটি দৃশ্যমান। 

source: The Dissent

Leave a Reply

Back to top button