ফেসবুকে নারী সেজে ‘অডিও সার্ভিস’র বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করছে পুরুষরা!

ফেসবুকে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভ নিউজ চলছে। স্ক্রিনে যখন ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠছে, ঠিক তখনই নিচের কমেন্ট সেকশনে একের পর এক কমেন্ট (মন্তব্য) জমা পড়ছে। তবে এই কমেন্টগুলো খবরের কোনো সাধারণ প্রতিক্রিয়া নয়।
কমেন্টগুলোতে বলা হচ্ছে, “ভিডিও কলে কাজ করতে চাইলে ইমু নাম্বারে নক করেন, ১০০% কাজ হবে…” কিংবা “ভিডিও কলে কাজ করি ১০ মিনিট ২০০ টাকা, ১৫ মিনিট ৩০০ টাকা, ৩০ মিনিট ৫০০ টাকা, ১ ঘণ্টা ১০০০ টাকা…”। প্রোফাইলের নামগুলো নারীদের, ছবিও নারীদের এবং কমেন্টের টেক্সটগুলো প্রায়ই এক। অনলাইনে বিশেষ সার্ভিস দেয়ার দাবি তাদের।
কিন্তু যাচাইয়ে দেখা গেছে, ‘সার্ভিস’ দিতে চাওয়া একাধিক ফোন নাম্বারে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিকাশ একাউন্ট খোলা আছে, একটি বাদে তার সবগুলোএকাউন্ট পুরুষ নামে খোলা। এমনকি কল দিলেও পাওয়া যাচ্ছে পুরুষের কণ্ঠ। এমন হাজারো চটকদার, অশ্লীল অফার এবং সেই সাথে বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর দিয়ে প্রতিনিয়ত ভরে যাচ্ছে দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোর ফেসবুক কমেন্ট বক্স।
এরই প্রেক্ষিতে দ্য ডিসেন্ট বাংলাদেশের পাঁচটি মূলধারার টিভি চ্যানেল যথা যমুনা টিভি, সময় টিভি, চ্যানেল ২৪, আরটিভি এবং বাংলাভিশনের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজের কমেন্ট সেকশন বিশ্লেষণ করেছে।
মূলত টিভি চ্যানেলগুলোর ফেসবুক পেজের গত ১৪-১৯ এপ্রিল প্রায় এক সপ্তাহের ৫০ হাজারের বেশি ভিউ আছে এমন ৬০ টি লাইভের কমেন্ট সেকশন যাচাই করে। পরবর্তীতে কমেন্ট বক্স থেকে এই ধরনের কমেন্টকারীর নাম, আইডি লিংক, কমেন্ট এবং মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করা হয়।
টিভি চ্যানেলের ফেসবুক পেজের কমেন্ট বক্সে নির্দিষ্ট সময়ে শতাধিক এই ধরনের কমেন্ট পাওয়া গেছে।
দ্য ডিসেন্টের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফেসবুকে যেসব সংবাদ বা লাইভ ভিডিওতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও ভিউ বেশি হয়, সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করে এই কমেন্টদাতারা।
শতাধিক কমেন্ট যাচাই করে এমন প্রায় ২৪টি ইউনিক ফেসবুক আইডি পাওয়া গেছে যারা ধারাবাহিকভাবে একাধিক টেলিভিশনের ফেসবুক পেজে কমেন্ট করেছেন। ২৪টি আইডির ১৭টি আইডি মূলত নারীদের নামে খোলা।
যেমন, সাদিয়া খান, মিম আক্তার , নিঝুম চাকমা, লামিয়া মুনতাহা, সুইটি আক্তার, ফারজানা এফজেড, আরোশি ইসলাম আরু, নাজমা আক্তার, নোভা আক্তার, মায়াবী মেয়ে, লিজা ভিডিও সার্ভিস, মারিয়া ইসলাম, তানিয়া, মাইশা খান, ফারহানা খাতুন, আমি লিজা, নিঝুম চাকমা এর মতো নারীদের নামে খোলা এবং আকর্ষণীয় ছবি ব্যবহার করে অসংখ্য ফেসবুক প্রোফাইল তৈরি করেছে।
এই আইডিগুলোর প্রত্যেকটি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সবগুলো আইডির ক্ষেত্রে প্রোফাইল পিকচার এবং কাভার ফটোর বাইরে তেমন আর ছবি বা অন্য কোনো পোস্ট দেখা যায়না। এছাড়া একাধিক আইডির প্রোফাইল পিকচার এআই দিয়ে বানানো অথবা অন্য আইডি থেকে নেয়া হয়েছে। যেমন, মীম আঁকটার আইডির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তার প্রোফাইল পিকচারটি জেমিনি দিয়ে বানানো। একইভাবে ফারজানা এফজেডের প্রোফাইল পিকচারটি নেয়া হয়েছে আরেকটি ফেসবুক আইডি থেকে যেখানে ছবিটি আপলোড করা হয়েছিল ২০২১ সালে।
মূলধারার টিভিগুলোর ফেসবুক পেজে কমেন্টকারী অন্তত দুইটি পুরুষ আইডি পাওয়া গেছে।।এর বাইরে ৫টি পরিচয়হীন আইডি পাওয়া যায়। এই আইডিগুলোর নাম যথাক্রমে ভিডিও কলে সার্ভিস নিলে আমাকে নক দিবা ইমুতে, কল সার্ভিস মিম ভিডিও, ভিডিও কলে কাজ করি।
পেজগুলোতে করা শতাধিক কমেন্ট বিশ্লেষণ করে অন্তত ২৪টি ফোন নাম্বার সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট। অন্তত চার্রটি ফোন নাম্বার পাওয়া গেছে যেগুলো একাধিক আইডি থেকে কমেন্ট করা হচ্ছিল। যেমন, তিনটি ফোন নাম্বার পাওয়া গেছে যেগুলো অন্তত তিনটি আইডি থেকে বারবার কমেন্ট করে সার্ভিস প্রদানের বার্তা দেয়া হচ্ছিল। আরেকটি নাম্বার অন্তত দুইটি আইডি থেকে কমেন্ট করে প্রচার করতে দেখা গেছে। এ থেকে কমেন্টগুলোতে এক ধরণের চক্র আকারে কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া একাধিক আইডি থেকে একাধিক নাম্বার প্রচার করতেও দেখা গেছে। যেমন, যমুনা টিভির লাইভে ‘সাদিয়া খান’ ও ‘মিম আক্তার’ গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে যমুনা টিভির একটি ফেসবুক লাইভ ভিডিওর কমেন্টে ‘Sadiya Khan’ নামক প্রোফাইল থেকে পরপর কমেন্ট করা হয়— “কাজ করতে চাও ইমুতে আসো, ১০০% কাজ হবে জাদের লাগবে ইনবক্সে এসএমএস দাও”। সেখানে যোগাযোগের জন্য 0185**86892 এবং 01888186**3 নম্বর দুটি ব্যবহার করা হয়। একই দিন ‘মিম আক্তার’ নামের প্রোফাইল থেকে 016230907** নম্বরটি দিয়ে বারবার কমেন্ট করা হয়, “ভিডিও কলে কাজ করতে চাইলে ইমু নাম্বারে নক করেন…”।
আরেকটি কৌশল এখানে লক্ষণীয়। একাধিক আইডি থেকে সময় টিভি, আরটিভি ও বাংলাভিশনের কমেন্টে তারা লেখে— “২’৪ ঘণ্টা সার্ভিস চালু যোগাযোগ: ইমু / হোয়াটঅ্যাপ – 01996997506 স্যাম্পল চার্জ: ৩০ টাকা কোনো ছবি শেয়ার করা হয় না ফ্রি অনুরোধ গ্রহণ করা হয় না”। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা ‘ঘণ্টা’, ‘সার্ভিস’, ‘যোগাযোগ’ শব্দগুলোর মাঝে বিশেষ ক্যারেক্টার (যেমন: ২’৪ ঘ’ণ্টা সা’র্ভিস) ব্যবহার করে, যাতে ফেসবুকের অ্যালগরিদম কমেন্টগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্প্যাম হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে।
এছাড়া এই চক্রের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলোর মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্টের আসল মালিকানা যাচাই করে দেখা যায়, বাহ্যিকভাবে ফেসবুক প্রোফাইলের নাম ‘সাদিয়া খান’ বা ‘নিঝুম চাকমা’ এবং কমেন্টের ভেতরে ‘লিজা’ বা ‘মিম’ নাম ব্যবহার করা হলেও, নম্বরগুলোর ভেরিফাইড বিকাশ অ্যাকাউন্টের নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন।
‘সাদিয়া খান’ পরিচয়ে ব্যবহৃত নম্বরটির বিকাশ নাম পাওয়া গেছে ‘MD. Foysal Siddk’ (মো: ফয়সাল সিদ্দিক)।
‘নিঝুম চাকমা’ পরিচয়ে ব্যবহৃত নম্বরের বিকাশ রেজিস্টার্ড নাম ‘Mst Zossna Begum’ (মোসাম্মৎ জোসনা বেগম)।
‘কল সার্ভিস মিম ভিডিও’ নামের প্রোফাইল থেকে ব্যবহৃত নম্বরের (01922856167) পেছনে পাওয়া গেছে ‘Md. Manjil’ নামক ব্যক্তির নাম।
অন্য একটি ‘মিম আক্তার’ আইডির নম্বরের বিপরীতে বিকাশ নাম এসেছে ‘Md Anowar Hossen’।
এর থেকে সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তরুণী বা নারীদের নাম-ছবি ব্যবহার করে মূলত একদল পুরুষ বা এক বা একাধিক পেশাদার প্রতারক চক্র আর্থিক প্রতারণার নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করছে।
পর্যবেক্ষনের অংশ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন ২০ টি নাম্বারে যোগাযোগ করা দ্য ডিসেন্ট। অন্তত বেশিরভাগ নাম্বারে কল করলে কেউ রিসিভ করেনি, তবে তিনটি নাম্বারে যোগাযোগ করলে পুরুষের কণ্ঠ পাওয়া যায় এবং এটা তাদের নাম্বার বলেই দাবি করে।
Facebook-এর “Adult Sexual Solicitation and Sexually Explicit Language” নীতিমালা অনুযায়ী প্রাপ্ত মেটার প্লাটফর্মে প্রাপ্তবয়স্কদের যৌন সেবা কেনা-বেচা বা এ ধরনের যোগাযোগের আহ্বান করা নিষিদ্ধ। মন্তব্য (comment), পোস্ট, পেজ, গ্রুপ বা মেসেজ—যেখানেই হোক না কেন, যদি কেউ যৌন সেবা অফার করে, খোঁজে, বা যোগাযোগের নম্বর/লিংক দিয়ে এমন সেবার প্রচার করে, তা অপসারণযোগ্য (removable content) হিসেবে গণ্য হতে পারে।
কিন্তু দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর লাইভ স্ট্রিমিংয়ে এভাবে প্রকাশ্যে অপরাধের বাজার বসে গেলেও চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নজরদারি বা মডারেশনের অভাব স্পষ্ট।
এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্ট কথা বলে যমুনা টিভির নিউ মিডিয়ার জয়েন্ট এডিটর মোরশেদুজ্জামান হিমুর সাথে। তিনি বলেন, “আমরা খেয়াল করেছি অফিসিয়ালি, মাঝে মধ্যে ম্যানুয়ালি কিছু কাজ করা হয় কিন্তু এত বেশি কমেন্ট যে সব ফিল্টারিং করা হয়ে ওঠে না, তবে আমরা অফিসিয়ালি শুরু করিনি তবে আলোচনা হচ্ছে, দ্রুতই ব্যবস্থা নিবো।”
একইভাবে চ্যানেল ২৪ এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, “এভাবে দেখা হয়না কমেন্ট, যদি কেউ বলে তা হলে দেখে হয়তো কিছু ডিলেট করা হয় কিন্তু অফিসিয়ালি কোন ব্যবস্থা নেই বা ফিল্টারিংও করা হয়না।”
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে ‘বিশেষ সার্ভিস দেয়া’ এবং সম্ভাব্য প্রতারনার ফাঁদের সামাজিক প্রভাব বিষয়ে দ্য ডিসেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে একটা বড় সংখ্যক যারা সোশ্যাল মিডিয়া ইউজ করে হাফ এডুকেটেড বা ইলিটারেট। যাদের হাতে অফুরন্ত সময় আছে। লেভেল অফ লিটারেসি, লিটারেসি রেট পাশাপাশি মিডিয়া লিটারেসি দুইটা কানেক্টেড। যে তারা আসলে অনেক ক্ষেত্রে অনেক কিছু বুঝতে পারে না যে কোন জায়গাতে কোন ধরণের কমেন্ট করবে।”
তিনি আরো বলেন, “একভাবে দেখলে নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর যদি আমি বলি যে ধরা যাক প্রচুর লোকের মধ্যে এই কন্টেন্টগুলো ছড়িয়ে পড়ছে এবং কেউ কেউ সেখান থেকে ইন্সপায়ার্ড হতে পারে বা মোটিভেটেড হতে পারে। আমরা যেটাকে বলি যে যুব সমাজকে বিপথগামী করতে পারে। মিডিয়ার জন্য ক্ষতিকরের চাইতে বিব্রতকর। চ্যানেলগুলোর উচিত গেট কিপিং করা তাহলে কিন্তু এটার পরিমাণটা কমানো যেতে পারে বা অনেক টাই নাই করা যেতে পারে।”
source: The Dissent

