জাতীয়

জাতি হিসেবে ৫৫ বছরে নিজেদের কতটুকু বিকশিত করতে পেরেছি, প্রশ্ন মাহমুদুর রহমানের

জাতি হিসেবে গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশ কতটা বিকশিত হতে পেরেছে, এমন প্রশ্ন তুলেছেন আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেছেন, একটি জাতি হিসেবে সফল হতে হলে আগে নিজেদের জাতিসত্তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষাকে দলীয়করণমুক্ত করতে এবং শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষকদের আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘বিপ্লব ও বিজয়ে ৩৬ জুলাই: নতুন প্রত্যাশায় আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) আয়োজিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জাতিসত্তা বিনির্মাণে শিক্ষক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তরের দায়িত্ব শিক্ষকদের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু জ্ঞান বিতরণের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং রাষ্ট্র ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘জাতি হিসেবে আমরা গত ৫৫ বছরে কতটা বিকশিত হতে পেরেছি’- এ প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ‘জাতি’ বলতে বাংলাদেশে কাদের বোঝানো হচ্ছে, তারও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জাতিসত্তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইতিহাসকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। বাঙালি পরিচয়ের বিকাশ ও এর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতির সংজ্ঞা নির্ধারণে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় ও জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথা বলেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের পরিচয়কে সামনে এনেছিলেন। তবে এ ধারণার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন ছিল। যেটা তিনি করে যেতে পারেননি।

শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের প্রসঙ্গে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, এটি শুধু শিক্ষকদের নিজেদের দাবি-দাওয়া বা সমস্যা নিয়ে কাজ করার সংগঠন হওয়া উচিত হবে না। বিশেষ করে জাতির পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকসমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

বক্তব্যে উচ্চশিক্ষায় দলীয়করণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল মেধা ও বৈষম্যহীনতা। অথচ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে চাকরি ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েও চাকরি পাননি এমন নজির আছে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তুলনামূলক কম ফলাফল করেও চাকরি পেয়েছেন- এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য শিক্ষকসমাজের একটি অংশও দায়ী।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের পরও উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি দলীয়করণমুক্ত হয়েছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ভিন্নমতের জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে।

শিক্ষকদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে মানুষ গড়ে তোলার বিষয়টি তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকদের কাছ থেকে মানুষ গড়ার শিক্ষা পাওয়া যায়। ফলে একজন মানুষকে মানবসম্পদে পরিণত করার বড় দায়িত্ব শিক্ষকদের ওপর।

তিনি বলেন, ইউরোপে যাওয়ার আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বাংলাদেশিরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিচ্ছেন। কেননা তারা মনে করেন বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যৎ নেই।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি শুধু অভিবাসনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যদি দেশের তরুণদের একটি অংশ মনে করে এখানে তাদের ভবিষ্যৎ নেই, তাহলে সেটিকে জাতি হিসেবে ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের সরাসরি রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষমতা না থাকলেও তারা একটি শক্তিশালী ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করতে পারেন। সরকারে যে দলই থাকুক, শিক্ষকসমাজ যদি রাষ্ট্রের জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটিকে উপেক্ষা করা সরকারের জন্য কঠিন হবে।

তিনি বলেন, দেশের তরুণদের যাতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিতে না হয়, সে জন্য শিক্ষকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষকদের সম্মিলিত মেধা ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যের শেষদিকে মাহমুদুর রহমান বলেন, আমি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তর্ক সামনে তুলে ধরছি- জাতি হিসেবে বাংলাদেশের বিকাশ, উচ্চশিক্ষায় দলীয়করণমুক্ত পরিবেশ এবং শিক্ষকদের মাধ্যমে মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

এক বছরের মধ্যেই ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের সংগঠনটির আয়োজনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের অংশ নেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে সংগঠনের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, এদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেটিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। তবে প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই ইউটিএল যে পরিসরে কাজ করেছে, তা আশাব্যঞ্জক। প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং দেশ হিসেবে আমাদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই এ সময়ে হাল ধরে রাখা জরুরি। একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে যেতে হবে।

এদিকে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করার দায়িত্ব নয়, বরং একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। তাই একজন শিক্ষকের জ্ঞান, প্রস্তুতি, ব্যক্তিত্ব ও শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার দক্ষতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থাও জরুরি।’

নতুন শিক্ষকদের পাঠদানের প্রস্তুতির ঘাটতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে অনেক মেধাবী নতুন শিক্ষক রয়েছেন, যাদের ফলাফল ভালো। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণ অনেকের থাকে না।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মারদিয়া মমতাজ বলেন, একসময় অফিসে বসে হেডফোন ব্যবহার করে প্রতিটি ক্লাসের আগে প্রস্তুতি নিতেন তিনি। একদিন একজন ক্লাস প্রতিনিধি এসে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি প্রত্যেক ক্লাসের আগে পড়েন? আমরা তো ভাবতাম সেমিস্টারের শুরুতে একবার পড়ে পুরো কোর্স পড়ানো হয়।’

তিনি বলেন, এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, অনেকের কাছেই নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাস নেওয়ার সংস্কৃতি অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন করা জরুরি।

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কেমব্রিজে কর্মরত থাকার সময় পূর্বঘোষণা ছাড়াই ক্লাস মনিটরিং করা হতো। পর্যবেক্ষণের পর শিক্ষক ও পর্যবেক্ষক একসঙ্গে বসে আলোচনা করতেন এবং পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উভয়ে স্বাক্ষর করে প্রতিষ্ঠানে জমা দিতেন।

‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু একজন শিক্ষককে একটি ট্যাব দেওয়া হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শিক্ষাখাতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়ার আগে সেগুলোর প্রয়োজনভিত্তিক মূল্যায়ন করা উচিত।

ইউটিএলের সাবেক আহ্বায়ক প্রয়াত অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বিশ্বাসের সন্তান ওয়াসিফ রহমান বলেন, ইউটিএল তার বাবার অত্যন্ত প্রিয় একটি উদ্যোগ ছিল। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে ইউটিএল নিয়ে তার যে স্বপ্ন ছিল, তা একদিন পূর্ণতা পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, আমরা যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেই সময়ে আল্লাহ যেন সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার তৌফিক দেন।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মোল্লা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকেই। অনুষ্ঠানে ইউটিএল এর কার্যক্রম নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রও উপস্থাপন করা হয়।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button