News
ইকবাল মাহমুদ টুকুসহ পরপর দুই প্রতিমন্ত্রীকে অপসারণ করেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকার

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সরকারের সময়ে বিশেষ করে বাজেট ঘোষণার পর বৃদ্ধি পেয়েছে বিদ্যুতের দাম। তবু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। জ্বালানিস্বল্পতা, বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের সংকট থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। ফলে ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে লোডশেডিং।
এমতাবস্থায়, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের নাজেহাল অবস্থা, বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ের মানুষের চরম ভোগান্তির কথা শোনা যাচ্ছে। ফলে, দেশে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সেবার প্রতি প্রতিনিয়ত অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ থেকে শুরু করে লেখালেখি, প্রতিবাদ কিংবা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গিয়ে হামলাসহ নানা ঘটনাই সংঘটিত হচ্ছে।
এ প্রেক্ষিতে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিপর্যয় নিয়েও বিভিন্ন মহলে বর্তমানে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে, জ্বালানি খাতে অস্থিরতার দরুন বর্তমান বিদ্যুৎ মন্ত্রীসহ তৎকালীন সময়ে পরপর দুইজন প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি নতুন করে সামনে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ২০০১ সালের নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ওই বছরের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের মে পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় অর্থাৎ বিএনপির সরকারের শেষ দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কৃষি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। শিল্প-কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হয়।
তাছাড়াও, ২০০৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। একই সময়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। পরবর্তীতে (২১ মে) তাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা হয়।
এর আগে, ইকবাল হাসান মাহমুদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন অবস্থায় জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) একটি উচ্চপর্যায়ের চক্রের হস্তক্ষেপের কারণে তিনি ঠিকমতো কাজ করতে পারেননি।
ইকবাল হাসান মাহমুদের স্থানান্তরের দিনই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন মেজর (অব.) আনোয়ারুল কবির তালুকদার, যিনি দায়িত্বে থাকাবস্থায়ই বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন।
ওই সময় সারাদেশে বিদ্যুৎ সংকট ও ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে প্রতিমন্ত্রী আনোয়ারুল কবির তালুকদার একপর্যায়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। পরে তাকে ২৯ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) অপসারণ করে সরকার। এ ঘটনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছিল।
সেগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডন ২৯ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, “দেশজুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের মধ্যে শুক্রবার আনোয়ারুল কবির তালুকদারকে বরখাস্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) তাদের গভীর রাতের সংবাদ অনুষ্ঠানে জানায়, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার কিছুক্ষণ পরেই তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
মাত্র চার মাস বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জনাব তালুকদার, বাংলাদেশকে গ্রাস করা ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সংকটের দ্বিতীয় শিকার হলেন। এদিন সকালে তিনি বেসরকারি এটিএন বাংলা টেলিভিশনকে জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য কিছুটা দায়ও স্বীকার করেন।
আনোয়ারুল কবির তালুকদার তখন বলেছিলেন, “আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ হলো, চার মাসেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমার সাধ্যমতো সবকিছু করা সত্ত্বেও আমি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি।”
দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় ২০০৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর (শনিবার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল কবির তালুকদার এমপি আজ পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই গত রাতে তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সৃষ্ট ব্যাপক সহিংসতার একদিন পর, গত রাতে দ্য ডেইলি স্টারকে তালুকদার বলেন, “এই খাতের ব্যর্থতার সমস্ত দায়ভার নিয়ে আমি আগামীকাল পদত্যাগ করব।”
তথ্যসূত্র: ডন, বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া ও সুরমা নিউজ।
source: The Dhaka Diary