সাবেক সেনাপ্রধান আজিজকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড নোটিস চেয়ে চিঠি

২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) বরাবর চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
আমিনুল ইসলাম বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ রয়েছেন।
তিনি জানান, বেনজীর আহমেদের বিষয়ে এর আগে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির জন্য আবেদন করা হয়েছে। আর আজিজ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত হওয়ার পর সোমবার তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়ে এনসিবির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় আজিজ আহমেদ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর মহাপরিচালক ছিলেন। পরে ২০১৮ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২১ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, কোনো আসামি বাংলাদেশে না থেকে অন্য কোনো দেশে অবস্থান করছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাকে গ্রেপ্তারে একইভাবে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশে কূটনৈতিক মাধ্যমে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর যেসব দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি নেই, সেসব ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারে সহায়তা চাওয়া হয়।
এনসিবি ইন্টারপোলের কাছে আজিজ আহমেদের বিষয়ে আবেদন পাঠিয়েছে কি না জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, আবেদনটি সোমবার এনসিবির কাছে দেওয়া হয়েছে। এরপর এনসিবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
ইন্টারপোলের নিয়ম অনুযায়ী, রেড নোটিস কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। কোনো সদস্য দেশের অনুরোধে এটি জারি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বের ও সাময়িকভাবে গ্রেপ্তারের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করা হয়। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আইনের ওপর নির্ভর করে।
শাপলা চত্বরের মামলায় আজিজ
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে সমাবেশকারীদের সরিয়ে দেয়।
২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। পরে এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
প্রসিকিউশনের দাবি, ৫ ও ৬ মে ঢাকাসহ চার জেলায় ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে ৫৮টি হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ২৭ জুলাই এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেদিন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক ৩১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তাদের একজন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ।
দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তে
শাপলা চত্বরের মামলা ছাড়াও আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক আজিজ আহমেদ এবং তার দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে অর্থ ও সম্পদ রাখার অভিযোগের কথা বলা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আদালতে দেওয়া দুদকের আবেদনে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত চলার কথা জানানো হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আজিজ আহমেদ ও তার পক্ষ থেকে আগে অস্বীকারের কথা প্রকাশিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
২০২৪ সালের ২০ মে দুর্নীতির অভিযোগে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, তিনি সরকারি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে এক ভাইকে অপরাধের দায় থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছেন।
এ ছাড়া সামরিক ক্রয়চুক্তিতে অনিয়ম এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তোলা হয়। তার পরিবারের সদস্যদেরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
আজিজ আহমেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, তিনি কোনো রাজনীতি বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন এবং কেন তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তিনি বিস্মিত।
আলজাজিরার তথ্যচিত্রে অভিযোগ
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলজাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রকাশের পর আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জনসমক্ষে আসে।
তথ্যচিত্রে আজিজ আহমেদের কয়েকজন ভাই এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়। তার এক ভাইকে হত্যা মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর বিদেশে অবস্থান এবং তাকে সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন আলজাজিরার প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। আজিজ আহমেদও অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও সাজানো বলে দাবি করেন।
এনআইডি নিয়েও তদন্ত
আজিজ আহমেদের পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়েও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছিলেন, আজিজ আহমেদের দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ভিন্ন নামে বা ভুল তথ্য দিয়ে এনআইডি নিয়েছেন কি না, তা তদন্তে কমিটি করা হয়েছে।
তবে ওই তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আর কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
source: The Dhaka Diary