News

আত্মহত্যায় এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর মৃত্যু, ৪৭ শতাংশই স্কুলপড়ুয়া

প্রতীকী ছবি© ঢাকা ডায়েরি সম্পাদিত
দেশে এক বছরে আত্মহত্যায় অন্তত ৪০৩ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই স্কুলপড়ুয়া। ২০২৫ সালে আত্মহত্যায় মারা যাওয়া শিক্ষার্থীদের ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল স্কুলের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রতি দুইজনের মধ্যে প্রায় একজনই স্কুলপড়ুয়া।
 
গণমাধ্যমে প্রকাশিত আত্মহত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সেমিনারে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়।
 
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আত্মহত্যায় মারা যাওয়া ৪০৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। কলেজের শিক্ষার্থী ছিল ৯২ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭ জন এবং মাদ্রাসার ৪৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। শতাংশের হিসাবে স্কুলশিক্ষার্থীদের হার ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কলেজশিক্ষার্থীদের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের ১৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।
 
২০২৫ সালের ৪০৩টি মৃত্যুর হিসাবে দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩৩ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তবে এ সংখ্যা আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্র নয়। কারণ আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি কোনো সরকারি জাতীয় মৃত্যুনিবন্ধনের হিসাব নয়। ফলে বাস্তবে আত্মহত্যায় শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাবে ৩১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫১৩। ২০২২ সালে ছিল ৫৩২।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার ঘটনা শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ আত্মহত্যার আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ থাকে। আত্মহত্যার চিন্তা থেকে শুরু করে পরিকল্পনা, এরপর চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণাতেও আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টার হার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও সম্মিলিত বিশ্লেষণে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৪টি গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়। এতে ২৭ হাজার ৯৯২ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব গবেষণার প্রায় অর্ধেক ছিল শিক্ষার্থীদের নিয়ে।
 
গবেষণার সম্মিলিত হিসাবে, জীবনের কোনো এক সময়ে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন। গত এক বছরে এমন চিন্তার হার ১৫ শতাংশ। জীবনের কোনো এক সময়ে আত্মহত্যার পরিকল্পনার হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। গত এক বছরে তা ৫ দশমিক ২ শতাংশ। জীবনের কোনো এক সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টার হার ৭ শতাংশ। গত এক বছরে তা ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
 
শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। তাদের মধ্যে জীবনের কোনো এক সময়ে আত্মহত্যার চিন্তার হার ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ। গত এক বছরে এই হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। গত এক বছরে আত্মহত্যার পরিকল্পনার হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর গত এক মাসে আত্মহত্যার চিন্তার হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
 
তবে গবেষণাগুলোর ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। এসব গবেষণার বড় অংশ শিক্ষার্থী ও শহরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত হওয়ায় এসব হিসাবকে সরাসরি জাতীয় পর্যায়ের হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
 
২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বাংলাদেশে আত্মহত্যার চেষ্টার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১১টি গবেষণা ও ২৫ হাজার ৭৭৪ জনের তথ্য নিয়ে করা ওই বিশ্লেষণে আত্মহত্যার চেষ্টার সম্মিলিত হার পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে এ হার ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। নারীদের মধ্যে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টার হার ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।
 
সময়ের হিসাবেও এ প্রবণতা বেড়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে আত্মহত্যার চেষ্টার হার ছিল ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
 
তরুণদের আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বিভিন্ন গবেষণায় বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যা, মানসিক চাপ, সম্পর্কের জটিলতা, পারিবারিক বিরোধ, পড়াশোনার চাপ ও পরীক্ষায় ব্যর্থতার মতো বিষয় উঠে এসেছে। এ ছাড়া বেকারত্ব ও আর্থিক চাপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানি, র‌্যাগিং, অনলাইনে হয়রানি, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদক গ্রহণ এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
 
তবে এসবের কোনো একটিকে আত্মহত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা পারিবারিক বিরোধ তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, হতাশা, একাকিত্ব, আগের আত্মক্ষতির ঘটনা বা প্রয়োজনের সময় সহায়তা না পাওয়ার বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।
 
দেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের কোনো না কোনো নির্ণয়যোগ্য মানসিক সমস্যা রয়েছে। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্নতাজনিত সমস্যার হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উদ্বেগজনিত সমস্যার হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
 
কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার হার খুবই কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, মানসিক সমস্যায় থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেননি। শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মানসিক সমস্যার বিস্তারের পাশাপাশি চিকিৎসা না পাওয়াও বড় সংকট।
 
এ সময় আত্মহত্যাকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনা না করে অপরাধপ্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। 
 
তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টাকে একটা মানসিক স্বাস্থ্য, সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব এবং পলিসি—এই বিষয়গুলো না ভেবে আমরা যদি এটাকে ক্রিমিনালাইজ করতে থাকি, আমরা যদি মনে করি যে এটা একটা অপরাধ এবং আমরা একজন অপরাধীর বিষয়ে ভাবছি, কথা বলছি, সেখান থেকে আমাদের সমাজে আসলে কিন্তু বিরাট ধরনের স্টিগমা আছে।’
 
আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসকে সামনে রেখে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। আত্মহত্যা চেষ্টার পর প্রতিবছর ৭ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুইসাইডাল আইডিয়েশনের সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি হবে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন মানুষের এ ধরনের চিন্তা আসতে পারে। এই চিন্তাগুলো আসা মানে প্রথম ধাপে আপনি ঢুকে গেছেন।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button