সেপ্টেম্বর মাসে ৬৮ রাজনৈতিক সহিংসতার আহত ৫২৭ জন, প্রায় সব ঘটনায় বিএনপি জড়িত

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোট ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৪ জন নিহত ও ৫২৭ জনের অধিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। আর ৬৮ টি ঘটনার মধ্যে ৬৬ ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি–এইচআরএসএস’।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৪, আহত ৫২৭ জন। মব সহিংসতায় নিহত ৯ জন ও আহত ৩২। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ২১ বন্দীর। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৩৬ নারী ও কন্যা শিশু। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৩৫ সাংবাদিক।
প্রতিবেদনে রাজনেতিক সহিংসতার ঘটনা ক্যাটাগরিতে সেপ্টেম্বর মাসে ৬৮ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৫২৭ জন। আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত আগস্ট মাসে ৭০ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ০৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন।
প্রতিবেদনে তথ্য অনুযায়ী,“সেপ্টেম্বর মাসে সহিংসতার অন্তত ৬৮ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩৫ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৪০ জন ও নিহত ১ জন। ৭ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৬১ জন, ৬ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৪২ জন ও নিহত ১ জন, ২ টি জামায়াত-আওয়ামীলীগের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৩ জন ও নিহত ১জন, ০৩ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন, ০৭ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৭ টি ঘটনায় আহত হয়েছে ৫০ জন ও নিহত ১ জন। নিহত ৪ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ০২ জন, বিএনপির ১ জন ও জামায়াতের ১ জন।”
এছাড়া, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ২টি ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দলীয় নেতাকর্মী নিহতদের মধ্যে বিএনপি ০৫ জন, জামায়াতের ১ জন ও চরমপন্থী ০১ জন। এছাড়া অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ২৩ টি ঘটনায় অন্তত ৬৩ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক ও মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৩ টির অধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৬৮৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। হয়েছে। এছাড়া, এ মাসে রাজনৈতিক, যৌথ অভিযান ও বিশেষ অভিযানে ২৮৭ টি ঘটনায় অন্তত ২১২০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১৬৬৫ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ৬২ জন, জামায়াতে ইসলামির ৩১ জন, এনসিপির ১ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ২৪ জন সদস্য রয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার ৩৫ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩২ জন।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবেদনের তথ্যমতে আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ১৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১২ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৩ জন সাংবাদিক। ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৪ টি মামলায় ৩ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এর মধ্যে সাইবার সুরক্ষা আইনের আওয়ায় ১ টি মামলায় ১ জনকে আটক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনায় এমাসে অন্তত ১২ টি ঘটনায় ১৪ জনকে আটক ও ১২ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে সমালোচনায় ০৬ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ০২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ০৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া এ মাসে জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩ জনকে কুপিয়ে, পিটিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, ১ জনকে নির্যাতন, ৬ জনকে চাকরিচ্যুত বা অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে সমালোচনায় ১জন শিক্ষককে আটক করা হলেও পরে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তেক্ষেপে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ০৩ টি মামলায় ১০ জনকে ও ০৩ জনকে আটকও করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বর সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ২১ জন আসামী মারা গিয়েছেন । এর মধ্যে ১১ জন জন কয়েদী ও ১০ জন হাজতী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২ জন ও ১৯ জন জন্য সাধারণ কয়েদী ছিলেন।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়েছেন ৫ জন। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শতাধিক পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ মাসে ২৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বর মাসে ২৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৭ (৬০%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৩ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । ধর্ষণের পর ৫ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এছাড়া ধর্ষণণের পর এক নারী আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে ৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৫ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ০৬ জন, আহত হয়েছেন ০৪ জন নারী এবং আত্মহত্যা করেছেন একজন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন, আহত হয়েছেন ২৭ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৬ জন নারী। এছাড়া একজন নারী দাহ্য পদার্থ এসিড নিক্ষেপের মাধ্যম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, ২৭১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৯৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া এ মাসে ৭জন শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন,“এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও কয়েকটি বিষয়ে অবনতি হয়েছে। মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্রীক সহিংসতা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, কারাগারে মৃত্য, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনার ধারাবাহিকতা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।”
source: The Dhaka Diary