‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে তোলপাড়, এটি আসলে কী?

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপির) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গত ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) দলীয় কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় ‘ডিপ স্টেট’ পরিভাষা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন বা ‘ডিপ স্টেট’ অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব জানিয়েছিল। যারা নিজেরাও সহযোগিতা চেয়েছিল এবং সরকারকেও সহায়তা করতে চেয়েছিল।
আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী, বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গণে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের কাছে প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে যে, ডিপ স্টেট আসলে কী? কাদেরকে মূলত ‘ডিপ স্টেট’ বুঝায়? তাদের কাজ-ইবা কী? বিষয়টি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে দ্য ঢাকা ডায়েরি।
‘ডিপ স্টেট’ কী?এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেরিয়াম-ওয়েবস্টারের মতে, ‘ডিপ স্টেট’ বলতে বোঝানো হয় এমন একটি কথিত গোপন নেটওয়ার্ক, যেখানে নির্বাচিত নয় এমন সরকারি কর্মকর্তা এবং কখনো কখনো বেসরকারি খাতের কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী (যেমন আর্থিক বা প্রতিরক্ষা খাত) জড়িত থাকে। তারা আইনের বাইরে থেকে প্রভাব খাটিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণ বা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে।
এই ডিপ স্টেটের শক্তি আসে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সম্পর্ক, কৌশল, বিশেষ দক্ষতা, প্রথা এবং পারস্পরিক মূল্যবোধ থেকে। এসব মিলিয়ে নাম-না-জানা আমলারা যেন একটি ‘অদৃশ্য সুপার সরকার’-এ পরিণত হয়, যার কাছে কারও জবাবদিহিতা থাকে না।
কিছু ক্ষেত্রে একে এমন এক অন্ধকার জগত হিসেবেও বর্ণনা করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রের ভেতরের প্রভাবশালী অংশ—বিশেষ করে সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার কিছু সদস্য—সহিংস উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবং অপরাধ জগতের সঙ্গে মিলিত হয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে গোপন ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
ক্যামব্রিজ ডিকশনারি অনুযায়ী, ‘ডিপ স্টেট’ মূলত সামরিক বাহিনী, পুলিশ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মতো সংগঠন, যেগুলো নির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষা করতে এবং নির্বাচিত না হয়েই একটি দেশ শাসন করার জন্য গোপনে কাজ করে বলে মনে করা হয়।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ‘ডিপ স্টেট’ বলতে সাধারণভাবে এমন এক গোপন ক্ষমতার নেটওয়ার্ককে বোঝায়, যা বাস্তব হতে পারে আবার অনেকের মতে কল্পনাও হতে পারে। এই নেটওয়ার্কে সাধারণত এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থাকে, যারা সরকারের ভেতরেই অবস্থান করলেও নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে থেকে নিজেদের লক্ষ্য ও স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করে।
এই ধারণার উৎপত্তি তুরস্কের ‘দেরিন দেভলেত’ শব্দ থেকে হলেও, বিভিন্ন দেশে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে দেখা যায়। কোথাও এটি একটি গোপন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার কোথাও এটি সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা বা আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। অনেক সময় কোনো দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়গুলো মিলিয়েই ডিপ স্টেট ধারণাটি তৈরি হয়।
শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানেই নয়, এই শব্দটি এখন জনপ্রিয় সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে এমন একটি ধারণা ফুটে ওঠে যে, দৃশ্যের আড়ালে একটি অদৃশ্য শক্তি নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি আরও বেশি আলোচনায় আসে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি সমালোচনামূলক বা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হতে থাকে।
আলোচনা সভার সেই বক্তৃতায় আসিফ মাহমুদ যা বলেছিলেন: আসিফ মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদের আসলে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়, তাদের থেকে আমাদের অফার করা হয়েছিল যে আপনারা শেখ হাসিনা সরকারের যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটা শেষ করেন। আপনারা শেষ করেন, আমরা আপনাদের সহযোগিতা করি।’
তিনি বলেন, ‘তাদের (ডিপ স্টেট) সার্টেইন কিছু শর্ত ছিল যে তাদের কিছু কিছু জায়গায় ফ্যাসিলিটেটেড করা। এবং তারা পুরো রোডম্যাপও করে নিয়ে আসছিল যে বিএনপির নেতাদের তো সাজা আছে; তো সাজা থাকলে সাধারণভাবে নির্বাচন দিলেও তারা নির্বাচন করতে পারবে না। তো তাদের সাজাগুলো আদালতের মাধ্যমে লেংদি (দীর্ঘায়িত) করে আপনারা তো জানেন, সেটা কীভাবে করা যায়। আদালতের ডেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে…তারেক রহমানের নিজের নামেও সাজা ছিল। সে যদি সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকত, নির্বাচন হলেও তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না।’
কীভাবে ক্ষমতায় থাকা যায়, সেই কৌশল সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা কিন্তু সেটাতে সায় দিইনি। আমরা সব সময় গণতন্ত্রকেই সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি কমিটমেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল বলেই নির্বাচনটা হয়েছে। নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য আমরা নিজেরা আগবাড়িয়ে পদত্যাগ করে চলে এসেছি।’
আসিফ মাহমুদের ভাষায় ডিপ স্টেটের সেসব প্রস্তাবের শর্ত যা ছিল:এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন-চার-পাঁচ মাসে বিভিন্ন আলোচনায় ডিপ স্টেটের দিক থেকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে তাদের কিছু স্বার্থ রক্ষা করলে তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে দীর্ঘদিন রাখতে আগ্রহী। দেন-দরবারের অংশ হিসেবে আমাদের অ্যাপ্রোচ করা হয়েছিল, হয়তো অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গেও তারা কথা বলেছিল।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার ডিপ স্টেটের সেই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি। সরকার নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। ফলে সরকার তাদের (ডিপ স্টেট) সঙ্গে সমঝোতায় যায়নি।’
‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে কথা এলো কীভাবে?সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্য কোনো উপদেষ্টা এখন পর্যন্ত ‘ডিপ স্টেট’ বা ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কোনো প্রস্তাবের বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। অর্থাৎ এ ধরনের দাবি বা আলোচনা মূলত তার বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে এনসিপির আহ্বায়ক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম গত ১০ মার্চ রাজশাহীতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তোলেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার পেছনে তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ জড়িত ছিল। তবে তিনি এই ডিপ স্টেট বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে বা কারা এতে অন্তর্ভুক্ত— সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে কিছুটা কৌতূহল ও আলোচনা তৈরি হলেও, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত বা নির্দিষ্ট তথ্য সামনে আসেনি।
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: thedhakadiary.com

