আ.লীগের শোডাউন: একে অপরকে দোষারোপ করছে বিএনপি-জামায়াত

রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শোডাউনের ঘটনায় একে অপরকে দোষারোপ করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্ররা। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে সামনে রেখে গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করছেন তার সমর্থকরা। এতদিন মিছিল করলেও উপস্থিতি ছিল হাতেগোনা।
সর্বশেষ, গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বড় ধরনের শোডাউন করেন তারা। এতে কয়েকশত নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেতে নানা স্লোগান দেন তারা।
অন্যান্য দিন দ্রুত মিছিল শেষ করে সটকে পরলেও শুক্রবারের মিছিলটি ছিল ব্যতিক্রম। তারা নির্ভয়ে মিছিল করেছেন—ভিডিওতে এমন দৃশ্যই দেখা গেছে। যদিও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭২ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি এলাকা ও তার বাসভবনের আশপাশে হঠাৎ এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। অনেকে মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরেও ওই এলাকায় কূটনীতিকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বসবাস করেন। স্বাভাবিকভাবে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত। তা না হলে সামনে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডও উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গুলশানে দলের স্থায়ী কমিটির সভায় দল ও প্রশাসন উভয়কেই আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেন দলীয় প্রধান তারেক রহমান। একই দিন দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে এ ঘটনার জন্য গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি এ সময় বিরোধী দলের অসহযোগিতার অভিযোগও আনেন।
আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় বিএনপি নেতারা সরাসরি বিরোধী দলকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তারা অভিযোগ করেন, অযৌক্তিক দাবি নিয়ে বিরোধী দল মাঠ গরম করতে চায়। তাই সেই সুযোগে ফ্যাসিবাদী শক্তি এ ধরনের তৎপরতা চালানোর সাহস পাচ্ছে। অনেকে আকার-ইঙ্গিতে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের অতীত সম্পর্ককেও সামনে আনছেন।
অপরদিকে রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ১১ দলীয় জোটের এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ প্রশ্ন তোলেন, ‘‘গুলশানের মতো জায়গায়, বিএনপির হেডকোয়ার্টার, বিএনপি প্রধানের নির্বাচনি এলাকা, সে জায়গায় কীভাবে এত বড় মিছিল হয়? প্রত্যেকটি জেলায় মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। সরকারের কি কোনও গোয়েন্দা বাহিনী নেই? কোনও মন্ত্রণালয় নেই? মন্ত্রী নেই।’’ বিরোধী দলের অন্য নেতারাও এমন অভিযোগ আনছেন।
দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপকে ভিন্নভাবে দেখছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, আসলে দোষারোপের রাজনীতি বাংলাদেশের পুরোনো সংস্কৃতি। একে অপরকে ঘায়েল করতেই এসব করা হচ্ছে। মূলত তাদের (আওয়ামী লীগ) নিয়ে ট্রাম্প কার্ড খেলতে চায় দুইপক্ষই। এভাবে চলতি থাকলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা আরও বাড়বে। তাই জুলাইয়ের শক্তি হিসেবে উভয়পক্ষকেই রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্না গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বিগত সরকার যেমন জাতীয় পার্টিকে নিয়ে টানাটানি করেছে, এখন আবার আওয়ামী লীগকে নিয়ে একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এমনটি চলতে থাকলে, তারা সুবিধা পেতে পারে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আগে ঝটিকা মিছিল হলেও এখন হচ্ছে শোডাউন। তাদের স্থায়িত্বও ছিল বেশি।’’ মাহমুদুর রহমান মান্না এর জন্য প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে না পারলে কোনও উদ্যোগই কাজে আসবে না।’’
‘বিরোধী দলকে গুরুত্বহীন করার পরিকল্পনা?’
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতাকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছে বিরোধী দল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক যুগ্ম আহ্বায়ক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘এগার দলীয় জোটের নেতৃত্বাধীন দলগুলো এখন পর্যন্ত সঠিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। সরকারের ইতিবাচক কাজের প্রশংসার পাশাপাশি নেতিবাচক কাজের সমালোচনা করছে। গণবিরোধী কোনও পদক্ষেপে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এরই অংশ হিসেবে আমরা বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছি। এতে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখে সরকারের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে’’
তিনি বলেন, ‘‘তারা আমাদের জাতীয় পার্টির মতো বিরোধী দল হিসেবে দেখতে চায়। এ কারণে আমাদের গুরুত্বহীন করার অংশ হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে মাঠে নামাতে চায় কিনা, অনেকে সে সন্দেহ করছেন।’’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘‘আসলে সরকার মুখে ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে কথা বললেও তারা ভেতরে ভেতরে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই লালন করছে। বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা পালন করলেও সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘অতীতে বিএনপি ও জামায়াত কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে মিছিল করলেও তার আগেই গোয়েন্দারা তৎপর ছিল। আমাদের কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে গুলি করেছে। আর গুলশানের মতো জায়গায় আওয়ামী লীগের মতো সন্ত্রাসী সংগঠন প্রকাশ্যে শোডাউনের আগে গোয়েন্দা সংস্থা জানতো না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।’’
সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব ক্ষেত্রেই সরকার ব্যর্থ। তার অভিযোগ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের কাউকে রাখেনি ক্ষমতাসীনরা। উন্নয়ন বরাদ্দে আমাদের প্রতি বৈষম্য করছে। আমাদের ইতিবাচক প্রস্তাবকেও নাকচ করছে। সব মিলিয়ে বুঝা যায়, তারা আমাদের সংকুচিত করে কোনও অশুভ শক্তির ওপর ভর করতে চায়। তবে এতে সরকারও যে খুব ভালোভাবে টিকতে পারবে, তা বলা কঠিন।’’
‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কে ফিরতে চায় বিরোধী দল?’
আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতার জন্য সরকারকে দোষারোপ করেছে বিরোধী দল। তবে তা প্রত্যাখ্যান করে ভিন্ন কথা বলছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তারা দাবি করেন, অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক ছিল প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের। তাই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিরোধী দলই আওয়ামী লীগকে এমন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে কিনা, সে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল পর্যায়ের নেতারাও সম্প্রতি বিভিন্ন কর্মসূচিতে এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘সরকার ক্ষমতায় থেকে কোনও নিষিদ্ধ সংগঠনকে সুযোগ করে দেবে, এ ধরনের অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। সরকার যেকোনও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধেই দায়িত্বশীল আচরণ করছে।’’ তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘‘বিরোধী দল অযৌক্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। কারণ তারা দেশের স্থিতিশীলতা চায় না। ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়।’’ তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগকে পুরোনো মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বিরোধী দল। তবে তিনি মনে করেন, তারা সত্যিই এমনটি করলে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে।’’
‘বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা উচিত’
সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতাকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি দোষারোপকে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামনে রাজনৈতিক পথরেখা ভিন্ন দিকে পরিচালিত হতে পারে। এক্ষেত্রে কোনও বড় সংগঠিত শক্তিকে রাজনীতির বাইরে রাখলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুল রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও তারা একটি সংগঠিত শক্তি। আমি মনে করি, অভিযুক্তদের বিচার হতে পারে। কিন্তু নিরপরাধ যারা, তাদেরে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। অন্যথায়, বিগত দিনে জামায়াত-শিবিরের মতো তারাও গুপ্ত রাজনীতির পথ বেছে নিতে পারে। যার মাধ্যমে সামনে তারা আরও বিপথগামী হতে পারে।’’ তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা উচিত।’’
source: Barta Bazar