বিএলআরআইয়ের প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, কৃষক শক্তির মানববন্ধন

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের দাবিতে মানববন্ধন করেছে জাতীয় কৃষক শক্তি।
বুধবার বিকেল ৪টায় সাভারে বিএলআরআইয়ের প্রধান ফটকের সামনে জাতীয় কৃষক শক্তির আয়োজনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মেহেদী হাসান মুন্নার সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জাতীয় কৃষক শক্তির সংগঠক আলম হাসান, ঢাকা জেলা উত্তর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলকারনাইন এবং জাতীয় যুব শক্তি ঢাকা জেলা উত্তরের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন শুভ।
মানববন্ধনে প্রধান বক্তার বক্তব্যে জাতীয় কৃষক শক্তির সদস্যসচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম বিএলআরআইয়ের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বিএলআরআইয়ের গবেষণার জন্য রাখা ১৩টি মোরগ চুরির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালেও একই শেড থেকে ৩৮টি মোরগ চুরির অভিযোগ সামনে এসেছিল। গবেষণার উপকরণই যদি চুরি হয়ে যায়, তাহলে সেই গবেষণার আউটপুট কী? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত গবেষণা থেকে খামারি ও কৃষকরা উপকৃত না হলে এসব প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
বিএলআরআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ড. এস. এম. জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাবেক পরিচালক (গবেষণা) ড. নাসরিন সুলতানাকে ঘিরে নিয়োগ, প্রকল্প ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেন তিনি। নাসরিন সুলতানার সাময়িক বরখাস্ত ও পরবর্তী পুনর্বহাল নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে এর প্রকৃত কারণ ও প্রক্রিয়া তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান গোলাম মর্তুজা সেলিম।
তিনি আরও বলেন, বিএলআরআইয়ের উৎপাদিত বিশেষ হ্যাচিং ডিম প্রান্তিক খামারিদের অনলাইন আবেদনের ক্রমানুসারে দেওয়ার কথা থাকলেও পছন্দের ব্যক্তিদের একাধিকবার ডিম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে আবেদন, বরাদ্দ ও বিতরণের তথ্য প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
মানববন্ধনে ড. মুহাম্মদ আবদুস সামাদের দায়িত্ব ও বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও ওঠা অভিযোগের তদন্ত দাবি করা হয়। বক্তারা বলেন, গত কয়েক বছরে প্রাণিস্বাস্থ্য গবেষণা খাতে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প, জিএইচএসএ (GHSA) প্রকল্প, উন্নয়ন প্রকল্প ও রাজস্ব বাজেটের আওতায় ক্রয় করা রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও ল্যাবরেটরি সামগ্রীর হিসাব এবং ইনভেন্টরি যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জাত উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালনা এবং প্রকল্পের অর্জন ও ব্যয়ের বিষয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়। বক্তারা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের নথি, অর্থ ব্যয়ের হিসাব ও অর্জনের তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানান।
উটপাখি প্রকল্প নিয়েও মানববন্ধনে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়। প্রকল্পের বরাদ্দ, প্রাণী আমদানি, মৃত্যু, জবাই, বর্তমান সংখ্যা এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের সরকারি নথি প্রকাশের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, বিভিন্ন প্রতিবেদনে উটপাখির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাই সরকারি রেজিস্টার, ক্রয় নথি, ভেটেরিনারি রেকর্ড, পোস্টমর্টেম ও ইনভেন্টরি যাচাই করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
মানববন্ধন থেকে বিএলআরআইয়ের চলমান ও সমাপ্ত বড় প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, ব্যয় ও অর্জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, অডিট আপত্তির প্রকৃত সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য জানানো, প্রকল্পের আওতায় কেনা গাড়ি ও সরঞ্জামের বর্তমান অবস্থান এবং প্রকল্পে মারা যাওয়া বা নিখোঁজ পশু-পাখির পোস্টমর্টেম ও নিষ্পত্তির নথি প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
এ সময় বক্তারা আরও জানতে চান, মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং প্রতিমন্ত্রীর ঘোষিত প্রতিবেদন প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা কী।
গোলাম মর্তুজা সেলিম বলেন, “সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটিকে আমরা ১৫ দিনের সময় দিচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে অপসারণ করে বিএলআরআইকে কৃষক ও খামারিবান্ধব কার্যকর গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “১৫ দিনের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে জাতীয় কৃষক শক্তি বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে।”
source: Asia Post