News

পদত্যাগের আগে পিএসসির দুই সদস্যকে চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো© সংগৃহীত ও সম্পাদিত
একের পর এক পদত্যাগ করছেন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্যরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. আব্দুল বারীর চা পানের আমন্ত্রণের পরদিন পদত্যাগের এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আমার দেশের প্রতিবেদন। 
 
ইতোমধ্যে কমিশনের দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। এ তালিকায় আরো কয়েকজন রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব সদস্য পদত্যাগ করছেন, নাকি তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে— তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের ধারাবাহিকতায় এবার সরকার পিএসসিতে হাত দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী দল।
 
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মুনেম গত ১৮ আগস্ট আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। ব্যক্তিগত কারণে ওই পদত্যাগ করলেও মূলত সরকারের ইচ্ছায় তাকে পদত্যাগ করতে হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে। 
 
তার যোগদানের পর পিএসসির ২০ সদস্যের মধ্যে আরো দুজনকে চা পানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের মধ্যে একজন হলেন সাবেক সচিব ড. মো. মহিউদ্দিন। তিনি ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। চায়ের আমন্ত্রণ পাওয়ার পরদিন গত শনিবার পদত্যাগ করেন কমিটির আরেক সদস্য বুয়েটের অধ্যাপক সোহেল রহমান।
 
ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন ড. মহিউদ্দিন। আর ড. সোহেল পদত্যাগের বিষয়ে আপাতত কোনো মন্তব্য না করে জানান, বিস্তারিত কারণ রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া চিঠিতে রয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলবেন বলে জানান তিনি। মানচিত্রদেখুন
 
এদিকে গতকাল এ দুই সদস্যের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। তার কার্যালয় থেকে দেওয়া আদেশে বলা হয়, পিএসসির সদস্য ড. মহিউদ্দিন ১৫ অক্টোবর এবং অধ্যাপক ড. সোহেল রহমান গত শনিবার রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন। রাষ্ট্রপতি গতকাল রোববার তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।
 
চেয়ারম্যান ছাড়া পিএসসির সদস্য মোট ২০ জন। দুজনের পদত্যাগের পর বর্তমানে সদস্য দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। পিএসসি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলেও মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না অনেকেই।
 
পিএসসির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৬ জন সদস্যকে বিদায় করার অংশ হিসেবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সদস্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে পদত্যাগ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসের মধ্যে বাকি সদস্যদের বড় অংশকে বিদায় করা হতে পারে। এরই মধ্যে আরো দুজন সদস্য চায়ের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। গত ১১ আগস্ট নতুন করে যোগ দিয়েছেন চারজন সদস্য। তারা হলেন—নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, ফেরদৌস হোসেন ও ইয়াসমিন গফুর।
 
এদিকে ৫০তম বিসিএসের ফল প্রকাশের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও রহস্যজনক কারণে তা আটকে রাখা হয়েছে। এ বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষা গত ১০ আগস্ট থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সম্পন্ন হয়। এরপর এক সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও তা প্রকাশ করা হয়নি।
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিএসসির একজন সদস্য বলেন, “একদিকে পুরোনো সদস্যদের বিদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে ৫০তম বিসিএসের ফল প্রকাশ করা হচ্ছে না, যা গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করছে। ফল প্রকাশের জন্য চেয়ারম্যানকে তাগাদা দিলেও তিনি রাজি হচ্ছেন না। এমনকি পিএসসির সদস্যদের বৈঠক ডাকার ক্ষেত্রেও অনীহা প্রকাশ করছেন।”
 
এ ব্যাপারে পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পিএসসির গণসংযোগ কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, ৫০তম বিসিএসের ফল প্রকাশের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ফল প্রকাশের সময়সীমা দেওয়া আছে। এর মধ্যে ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে ।
 
বিভিন্ন ক্যাডারে ১,৭৫৫টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য গত বছরের ২৬ নভেম্বর ৫০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিসিএস পরীক্ষা এক বছরের মধ্যে শেষ করার সুপারিশ করেছিল।
 
নভেম্বরের মধ্যে আর কোনো কর্ম কমিশনের সদস্য পদত্যাগ করবেন কি না— জানতে চাইলে মতিউর রহমান জানান, এ ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। পদত্যাগের পরই শুধু তারা বিষয়টি জানতে পারছেন।
 
সূত্রমতে, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর তৎকালীন পিএসসির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইনসহ ১২ সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব পেয়ে তিনি পিএসসিতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেন এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। বিশেষ করে পতিত সরকারের সময়কার বিসিএস জট কাটিয়ে বছরে একটি বিসিএস সম্পন্ন করা ছিল সংস্কারের অন্যতম বিষয়।
 
গত ১৮ আগস্ট হঠাৎ করেই মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর বিভিন্ন মহলে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর বিষয় নিয়ে কথা ওঠে। বিদায়ী চেয়ারম্যান মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো আবারও ২০০ করতে রাজি না হওয়ায় তাকে এ পদ ছাড়তে হয়েছে বলেও গুঞ্জন ওঠে।
 
‘পিএসসি মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয়’
পিএসসি সদস্যদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এ সরকার হাত দিয়েছে। ছাত্ররা মেধার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমে এসেছিল। কিন্তু একটির পর একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন পিএসসির ওপর হাত পড়েছে।”
 
একজন মন্ত্রী পিএসসি সদস্যদের ডেকে নিয়ে চায়ের টেবিলে পদত্যাগের কথা বলছেন— এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এটি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয় এবং পিএসসির কোনো মেম্বারকে এভাবে কথা বলার কোনো অধিকার মন্ত্রীর নেই। এর অর্থ সরকারি চাকরির আসল জায়গাটি এখন তারা পুরোপুরি দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে পূর্ণ করতে চায়।”
 
এদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ফেসবুকে লিখেছেন, “জুলাই সনদ অনুযায়ী পিএসসি সংস্কার করতে হবে। সংস্কার ব্যতীত পিএসসিতে কোনো দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হলে এবং আবারও ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠলে, সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”
 
সূত্রমতে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার পদে পরিবর্তন আনা শুরু করে। ইতোমধ্যে প্রায় সবগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের মেয়াদ পূর্তির অনেক আগেই অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে দলীয়করণসহ নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button