News

গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্ব্যকেন্দ্রের জমি ২০০৪ সালে সেই সমিতির নামে বরাদ্দ চান বিএনপির এমপি মিষ্টি

এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও ব্যাকগ্রাউন্ড ভাঙচুরের ধ্বংসস্তূপ© ঢাকা ডায়েরি সম্পাদিত
রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় আলোচনায় থাকা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সরাসরি সম্পৃক্ততার দাবি করেছেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান)। এ দাবির পক্ষে ২০০৪ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে দেওয়া একটি আবেদনপত্র প্রকাশ করেছেন তিনি। ওই চিঠিতে সমিতির সভাপতি হিসেবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করেছেন আরমান।
 
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ব্যারিস্টার আরমান ওই দাপ্তরিক নথি প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘সমিতির সাথে মিষ্টির সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ!’
 
আরমানের দাবি, অনেকেই বিষয়টি অস্বীকার করার চেষ্টা করলেও অফিসিয়াল নথিপত্র মিথ্যা বলে না। তার ভাষ্য, সংযুক্ত দাপ্তরিক চিঠিতে স্পষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’-এর কার্যক্রম ও আবেদনের মূল দায়িত্বে ছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
 
তিনি নথির কয়েকটি তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে সংগঠনের নাম হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’। রেজিস্ট্রেশন নম্বর হিসেবে নথিতে ৫৫/৯২ ইং লেখা রয়েছে। আবেদনটি করা হয়েছে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী বরাবর। আর আবেদনকারী হিসেবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামের সঙ্গে ‘সভাপতি, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ, মিরপুর, ঢাকা’ পদবি উল্লেখ রয়েছে।
 
আরমান বলেন, আবেদনপত্রের নিচে সভাপতি হিসেবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম ও স্বাক্ষর স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি শুধু সমিতির সাধারণ সদস্য ছিলেন না, বরং সভাপতি হিসেবে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন—এমন দাবি করেন তিনি।
 
স্ট্যাটাসের শেষ দিকে আরমান লেখেন, ‘সত্য কখনো গোপন রাখা যায় না!’
 
প্রকাশ করা চিঠিটি ২০০৪ সালের বলে উল্লেখ করেছেন আরমান। ওই সময় বাংলাদেশের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। তৎকালীন সময়ে মন্ত্রীর কাছে একটি আবেদন করেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। চিঠির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর মিরপুরের সেকশন-১, ব্লক-ডি, এভিনিউ-৪ এলাকায় থাকা প্রাতিষ্ঠানিক প্লট উন্নয়নের স্বার্থে ৬/১ নম্বর প্লটের ১০ কাঠা জমি ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’-এর অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার আবেদন। চিঠিতে সমিতির সদস্যদের দীর্ঘদিনের ব্যবসার কথাও তুলে ধরা হয়। 
 
এতে বলা হয়, ওই জায়গায় সমিতির সদস্যরা কাঁচা-পাকা দোকানঘর নির্মাণ করে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ বছর ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য করে কোনো রকমে দিনাতিপাত করছিলেন।
 
আবেদনপত্রে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে সেখানে আরও ঘর নির্মাণ করে জমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়। তখন তৎকালীন মন্ত্রীর নির্দেশে ১৯৯৩ সালের ৮ এপ্রিল তৎকালীন উপ-কমিশনার (এস্টেট)কে নকশাসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত কপিও আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
 
চিঠিতে বলা হয়, ওই নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। সমিতির অনুকূলে নকশা অনুমোদন করা হয়। ওই জায়গার দখলদারদের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়। এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী, গৃহসংস্থান বিভাগ-১, মিরপুর এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ঢাকা সার্কেলের মাধ্যমে নকশা অনুমোদনের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
 
এরপর পরিচালক, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর আংশিক বিস্তার নকশাসহ পুরোনো পাঁচটি প্লট একত্র করে সমিতির অনুকূলে নকশা অনুমোদন দেন বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে। সেখানে নথি নম্বর ১৩/৪৩০ উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী অনুমোদিত নকশাটি জমির স্বাক্ষরসহ জমি বরাদ্দের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপ-কমিশনার (এস্টেট)-এর কাছে পাঠান। তবে আবেদনপত্রে অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন এক প্রভাবশালী মহলের ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কালো হাতের’ প্রভাবে সমিতির অনুকূলে অনুমোদিত নকশা থাকা সত্ত্বেও ওই প্লট একটি বহিরাগত ‘ছিনতাইমূলক বণিক সমিতি’র অনুকূলে অন্যায় ও বেআইনিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
 
এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত সমিতির প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, এর ফলে গরিব ব্যবসায়ীরা পথে বসেছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
 
এ অবস্থায় সমিতির সদস্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পরিবার-পরিজনের জীবন বাঁচানোর স্বার্থে ৬/১ নম্বর প্লটটি কেনার মাধ্যমে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। চিঠির এক স্থানে জমির পরিমাণ ১৬ কাঠা বা তার কিছু বেশি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে বিষয়বস্তুতে ১০ কাঠা জমির কথা উল্লেখ রয়েছে।
 
আবেদনপত্রে আরও বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্লটটি সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়া হলে সরকার লক্ষাধিক টাকা লাভবান হবে। একই সঙ্গে স্বল্প পুঁজির দরিদ্র পরিবারগুলোও বেঁচে থাকার অবলম্বন পাবে। সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের সব নিয়মনীতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও নিয়মনীতি অনুসরণ করে জমিটি বরাদ্দ দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো হয়।
 
এদিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
 
রবিবার দুপুরে তার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শনে যায়। তারা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, মিষ্টির নেতৃত্বে সেখানে ‘ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ ও মবতন্ত্র’ কায়েম করা হয়েছে।
 
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বিএনপির একজন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির নেতৃত্বে, যার স্বামী এই এলাকার কমিশনার ছিলেন একসময় এবং যার ভাই ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন একসময়, তার নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ, একটা মবতন্ত্র কায়েম করা হলো। আমরা তাদের সেই সংগ্রামকে সম্মান করি। কিন্তু আমরা দেখলাম তার নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ ও মবতন্ত্র কায়েম করা হলো।’
 
রাড্ডা সেন্টারের ভেতরের পরিস্থিতি তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, ওষুধ, ইনজেকশন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যন্ত লুট করে নেওয়া হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য রাখা টিকাও লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
 
এর আগে, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে দরিদ্র ও অসহায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে জমিটির সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়।
 
স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনায় রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেন। এতে স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে শাহ আলী থানা পুলিশ। 
 
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বিভিন্ন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও স্টিলের আলমারি নিয়ে যায়। পরে নৈশপ্রহরীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানার ও সাইনবোর্ড লাগানো হয়। মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা দরিদ্র ও অসহায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে।
 
এদিকে এসব ঘটনায় সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এখানে দুষ্কৃতকারীরা, দুর্বৃত্তরা যার যে পরিচয় থাকুক, সেটা আমরা আমলে নেব না। যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদেরও রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে। কিন্তু আমরা সেদিকে নজর দেব না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে বলেছি। এটা খুব সিরিয়াস অ্যাকশন নেওয়া হবে। যে-ই জড়িত থাকুক না কেন। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাইনি। যারা দুর্বৃত্ত, তাদের কারও কারও হয়তো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে। কিন্তু সেটা আমরা আমলে নেব না। যে দলের পরিচয়ই হোক, আমরা এখানে যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের অপরাধী হিসেবে ট্রিট করব।’

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button